সুন্দরবনে নেই, মোংলায় এলো কীভাবে এই মুখপোড়া হনুমান?
সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার করমজল মোংলা থেকে নদীপথে মাত্র প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে। পশুর নদী পেরিয়ে এই পথেই যেতে হয় সুন্দরবনের ওই অংশে।
সেই সুন্দরবনের কাছের মোংলা শহরের ব্যস্ত সড়কে এবার দেখা মিলল এমন এক হনুমানের, যার স্বাভাবিক বিচরণ এই এলাকায় নয়।
নিচ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন পথচারীরা। কেউ বাসস্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছেন, কেউ গাড়ির অপেক্ষায়। আর তাঁদের মাথার ওপর বটগাছের মোটা ডালে বসে নিশ্চিন্তে রুটি খাচ্ছে একটি ধূসর রঙের হনুমান।
রোববার সকালে মোংলা নদী পার হয়ে স্থায়ী বন্দরসংলগ্ন বাসস্ট্যান্ডের কাছে এমন দৃশ্যই দেখা গেল।
সময় তখন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে। ব্যস্ত সড়কের পাশে গাছের ডালে বসে থাকা হনুমানটির মানুষের চলাচল নিয়ে যেন কোনো আগ্রহ নেই। রুটি খাচ্ছিল, মাঝে মধ্যে খাওয়া থামিয়ে নিচের মানুষের দিকে তাকাচ্ছিল, আবার খাবারে মন দিচ্ছিল।
বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী, এটি মুখপোড়া হনুমান বা কমন ল্যাঙ্গুর (Semnopithecus entellus) বলে ধারণা করা হচ্ছে। ধূসর শরীর, কালো মুখ ও হাতের পাতার এই প্রজাতির হনুমান দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোর ও কেশবপুর অঞ্চলে বেশি দেখা যায়।
তাহলে সুন্দরবনের এত কাছে মোংলার এই ব্যস্ত এলাকায় মুখপোড়া হনুমানটি এলো কোথা থেকে?
স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক দিন আগে মোংলা বন্দরসংলগ্ন এলাকায় একসঙ্গে দুটি হনুমানকে দেখা গিয়েছিল। কখনো গাছের ডালে, কখনো রাস্তার পাশে, আবার কখনো কলাবোঝাই ট্রাকের ওপরও দেখা গেছে তাদের।
পরে স্থানীয়রা জানান, ওই দুটি হনুমানের একটি ট্রাকের চাপায় মারা গেছে। নারী হনুমানটি মোংলার একটি এলপি গ্যাস ফ্যাক্টরির গেটের কাছে মারা যায় বলে তাঁদের ভাষ্য।
মৃত হনুমানটির কোনো ছবি বা ঘটনার স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই বিষয়টি স্থানীয়দের বক্তব্য হিসেবেই থাকছে।
এখন যে হনুমানটি ঘুরে বেড়াচ্ছে, স্থানীয়দের ধারণা সেটি পুরুষ। তাঁদের কেউ কেউ বলছেন, দুটি হনুমান একসঙ্গেই এলাকায় এসেছিল। একটি মারা যাওয়ার পর অন্যটিকেই এখন মোংলার বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে।
তবে হনুমান দুটি জোড়া ছিল কি না, বা একটি মারা যাওয়ার পর অন্যটি তাকে খুঁজছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলার মতো কোনো তথ্য নেই।
মোংলার সাংবাদিক মনিরুল হায়দার ইকবালের ধারণা, যশোরের কেশবপুরের দিক থেকে কোনো কলাবোঝাই ট্রাকে চড়ে হনুমানটি মোংলায় এসে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, কেশবপুর ও আশপাশের এলাকায় এই প্রজাতির হনুমানের বিচরণ রয়েছে। ওই এলাকা থেকে কলাবোঝাই ট্রাক বিভিন্ন পথে মোংলায় আসে। কোনো একটি ট্রাকে উঠে অজান্তেই হনুমান এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলে আসতে পারে।
তবে এটিকে নিশ্চিত তথ্য নয়, সম্ভাব্য কারণ হিসেবেই দেখছেন তিনি।
বন্যপ্রাণী নিয়ে প্রায় ৩৯ বছর কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে প্রাণী বিশেষজ্ঞ ও সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুর রবের।
তাঁর অভিজ্ঞতাও বলছে, কলাবোঝাই গাড়ির সঙ্গে হনুমান এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলে আসতে পারে। নতুন কোনো এলাকায় পৌঁছে খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে প্রাণীটি ঘুরে বেড়াতে পারে বলেও জানান তিনি।
সঙ্গী হারানোর পর কোনো প্রাণীর আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে কি না, জানতে চাইলে আব্দুর রব বলেন, কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে অস্থিরতা বা বিচ্ছিন্নভাবে ঘোরাফেরার মতো আচরণ দেখা যেতে পারে। তবে মোংলায় ঘুরে বেড়ানো এই হনুমানটি সঙ্গী হারানোর কারণে এমন আচরণ করছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
বন্যপ্রাণীর আচরণকে মানুষের প্রেম বা বিরহের ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করাও ঠিক নয়। খাবার, আশ্রয়, নিরাপত্তা বা অপরিচিত পরিবেশে পথ হারিয়েও একটি বন্যপ্রাণী একই এলাকায় ঘুরে বেড়াতে পারে।
তাই আপাতত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, কীভাবে এই মুখপোড়া হনুমানটি মোংলায় এসেছে।
হয়তো কোনো কলাবোঝাই ট্রাকে চড়ে কেশবপুর থেকে এসেছে।
হয়তো অন্য কোনো এলাকা থেকে মানুষের অজান্তে চলে এসেছে।
অথবা খাবার ও আশ্রয়ের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়েছে মোংলার ব্যস্ত এলাকায়।
রোববার সকালে বটগাছের ডালে বসে রুটি খাওয়া হনুমানটি একসময় উঠে দাঁড়াল। চারপাশে তাকিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেল অন্যদিকে।
নিচে তখনও মানুষের ব্যস্ততা। পথচারীরা যাচ্ছেন, গাড়ি চলছে, বাসস্ট্যান্ডে ভিড় বাড়ছে।
সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের এই শহরে বন্যপ্রাণীর দেখা মেলা অবশ্য একেবারে অসম্ভব নয়। কিন্তু স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, যে মুখপোড়া হনুমান এখানে ঘুরছে, তার স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র এই এলাকা নয়।
কয়েক দিন আগে একই এলাকায় দুটি হনুমানকে দেখা গিয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে একটিকে।
একটির পরিণতি স্থানীয়দের ভাষ্যেই জানা যাচ্ছে। কিন্তু বেঁচে থাকা এই মুখপোড়া হনুমানটি কীভাবে মোংলায় এলো, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
Comments