স্পেন-আর্জেন্টিনা ফাইনাল: বিশ্বজয়ের মুকুট নির্ধারণ করবে যে ৬টি দ্বৈরথ
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আজ বিশ্বফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটের জন্য লড়বে স্পেন ও আর্জেন্টিনা। ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে ধারাবাহিক এবং সেরা দুটি দলের এই ফাইনাল কেবল দুই দেশের লড়াই নয়, এটি ডাগআউট থেকে মাঠ পর্যন্ত ফুটবলীয় কৌশলের এক পরম প্রদর্শনী।
ইউরোপীয় ফুটবলের সুশৃঙ্খল 'ইঞ্জিন' স্পেন নাকি মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে ফাইনালে ওঠা ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা—কার মাথায় উঠছে মুকুট? ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুবার বিশ্বকাপ ধরে রাখার রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আলবিসেলেস্তেরা। তবে এই মহাযুদ্ধের ভাগ্য গড়ে দেবে মাঠের ভেতরের সুনির্দিষ্ট ৬টি দ্বৈরথ।
রদ্রি বনাম এনজো ফার্নান্দেজ ও ম্যাক অ্যালিস্টার
সেমিফাইনালে ফ্রান্সের গতিদানবদের রুখে দিয়ে স্পেনের মাঝমাঠে মাস্টারক্লাস দেখিয়েছেন ব্যালন ডি'অর জয়ী মায়েস্ত্রো রদ্রি। চোট কাটিয়ে নিজের সেরা ছন্দে ফেরা রদ্রি যদি বল পায়ে একটুও সময় বা জায়গা পেয়ে যান, তবে পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের বুটের তলায় নিয়ে নেবেন।
আর্জেন্টাইনদের 'ইঞ্জিন রুমে' এই ছন্দ ভাঙার দায়িত্ব থাকবে এনজো ফার্নান্দেজ এবং অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের ওপর। এই জুটিকে এক মুহূর্তের জন্যও রদ্রিকে চোখের আড়াল করা চলবে না। বড় স্বস্তি হলো, কাতার বিশ্বকাপের সেই অতিমানবীয় রূপটা এই দুই ত্রাতা ঠিক ফাইনালের আগেই ফিরে পেয়েছেন, যা স্পেনের রক্ষণাত্মক দুর্গ কাঁপিয়ে দিতে সক্ষম।
উনাই সিমন বনাম এমিলিয়ানো মার্তিনেজ
পরিসংখ্যানের বিচারে স্পেনের গোলকিপার উনাই সিমন অনেক এগিয়ে; পুরো টুর্নামেন্টে গোল হজম করেছেন মাত্র একটি। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার জাল কেঁপেছে সাতবার। তবে ফাইনালে প্রভাবের দিক থেকে এমিলিয়ানো মার্তিনেজের পাল্লাই ভারী। মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার এক অদ্ভুত জাদুকরী ক্ষমতা আছে এই আর্জেন্টাইন প্রাচীরের। বিপরীতে, সিমন কিছুটা অবমূল্যায়িত হলেও টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ আজ তাকে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষায় ফেলবে।
মিকেল ওইয়ারজাবাল বনাম হুলিয়ান আলভারেস/লাউতারো মার্তিনেজ
আক্রমণভাগে নিজ নিজ দলের জন্য প্রায় একই ধরনের কার্যকর ভূমিকা পালন করেন এই তারকারা। সৌদি আরব ও অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে জোড়া গোল করে স্পেনের নিভৃতচারী নায়ক এখন ওইয়ারজাবাল। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার হুলিয়ান আলভারেস চোটের কারণে এবার কিছুটা মন্থর। ফলে ফাইনালের আগে কোচ লিওনেল স্কালোনি মধুর সমস্যায় পড়েছেন—ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বদলি নেমে জয়সূচক গোল করা লাউতারো মার্তিনেজকে তিনি শুরুর একাদশে ফেরাবেন, নাকি আলভারেসের ওপরই ভরসা রাখবেন?
লিওনেল মেসি বনাম মার্ক কুকুরেয়া
৩৯ বছর বয়সেও মাঠের দুই প্রান্ত ব্যবহার করে মেসি এখনো বিশ্বের অন্যতম সেরা কার্যকর উইঙ্গার। চেনা ড্রিবলিং আর বক্সে মাপা ক্রসে তিনি স্পেনের লেফট-ব্যাক মার্ক কুকুরেয়ার ডিফেন্সিভ জোন কাঁপানোর চেষ্টা করবেন। তবে মেসি নিচে নেমে রক্ষণাত্মক দায়িত্ব পালন করেন না বললেই চলে। মেসি-হীন সেই ফাঁকা জায়গার সুযোগ নিয়ে কুকুরেয়া ওপরে উঠে আক্রমণ শানাতে পারেন। তাই কুকুরেয়াকে ব্যস্ত রাখতে রদ্রিগো দে পল কিংবা জুলিয়ানো সিমেওনেকে বিশেষ পাহারায় রাখতে পারেন স্কালোনি।
লামিন ইয়ামাল বনাম নিকোলাস তাগলিয়াফিকো
১৯ বছর বয়সী স্প্যানিশ বিস্ময় লামিন ইয়ামাল তার গতি আর ড্রিবলিংয়ের ঝলক দেখালেও নিজের আকাশচুম্বী মানদণ্ড অনুযায়ী এখনো পুরোপুরি জ্বলে উঠতে পারেননি। তবে ফাইনালই হতে পারে তার সেরা মঞ্চ। তার সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়াবেন ৩৩ বছর বয়সী অভিজ্ঞ আর্জেন্টাইন লেফট-ব্যাক নিকোলাস তাগলিয়াফিকো। কাতার ফাইনালে দেম্বেলেকে বোতলবন্দি করা তাগলিয়াফিকোকে আজ ইয়ামালের গতি রুখতে মাঝমাঠ থেকে এনজো বা লিসান্দ্রো মার্তিনেজের নিরেট সাহায্য পেতেই হবে।
লুইস দে লা ফুয়েন্তে বনাম লিওনেল স্কালোনি
মাঠের লড়াই ছাপিয়ে এটি আসলে ডাগআউটের দুই মাস্টারমাইন্ডের ট্যাকটিক্যাল দাবার চাল। স্পেনের দে লা ফুয়েন্তে শুরুতে গাভিকে নিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিলেও দ্রুতই নিজেকে শুধরে নেন। পেদ্রিকে বেঞ্চে বসিয়ে ফ্যাবিয়ান রুইসকে খেলানোর মতো সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি টানা ছয় ম্যাচ জিতে দলকে ফাইনালে এনেছেন।
অন্যদিকে, সেমিফাইনালে সঠিক বদলি নামিয়ে বাহবা পেলেও এর আগে বড্ড বেশি 'মেসি-নির্ভর' কৌশলের কারণে সমালোচিত হয়েছেন স্কালোনি। দে লা ফুয়েন্তের হাতে এখন এক গোছানো ও ভারসাম্যপূর্ণ উইনিং কম্বিনেশনের দল রয়েছে। তাই ফাইনালে স্পেনের এই সুশৃঙ্খল দলের বিরুদ্ধে একবার পিছিয়ে পড়লে, সেখান থেকে আর্জেন্টিনার ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।
Comments