যে শহর বৃষ্টিতে থেমে যায় সেটি কেমন করে হয় বাণিজ্যিক রাজধানী?
টানা ভারী বৃষ্টিতে আবারও বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম। নগরের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সড়কে যান চলাচল ব্যাহত,শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত,অফিসগামী মানুষ ও সাধারণ যাত্রী চরম ভোগান্তিতে। কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের প্রধান বন্দরনগরীর স্বাভাবিক জীবন।
এবারের পরিস্থিতি ব্যতিক্রমী। এক দিনের বৃষ্টিতে ৪৩ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে। এমন অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু অল্প বৃষ্টিতেও চট্টগ্রাম ডুবে যায়। এই বদনাম বছরের পর বছর ধরে বহন করতে হচ্ছে? কেন বর্ষা এলেই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী এবং কথিত বাণিজ্যিক রাজধানী নাগরিক দুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হয়?
চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার ঘোষণা নতুন নয়। সাম্প্রতিক সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এই প্রত্যাশার কথা বলেছেন। অতীতে প্রায় প্রতিটি সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বই একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়েছে।
আসলে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হয় মূলত দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এখানে অবস্থিত বলে। কিন্তু একটি আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্যিক নগরী গড়ে তুলতে শুধু সমুদ্রবন্দরই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন উন্নত অবকাঠামো,কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা,নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। যে শহর ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস শুনলেই মানুষ আতঙ্কিত হয়,যে শহরে সামান্য বৃষ্টিতেই শিল্পকারখানা,ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে,সেখানে বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি হবে কীভাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বারবার ফিরে আসতে হয় চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যার দিকে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে,হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে,কিন্তু স্থায়ী সমাধান আসেনি। কারণ সমস্যার মূল জায়গাগুলোকে উপেক্ষা করে বারবার জোড়াতালি দেওয়া হয়েছে। নগরীর ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে বিবেচনায় না এনে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের ফলেই আজকের এই দুরবস্থা।
চট্টগ্রামের আরেকটি বড় সংকট হলো প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ,সিটি করপোরেশন,ওয়াসা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড-সবাই নগর পরিচালনায় কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। কিন্তু বাস্তবে একেকটি সংস্থা একেকভাবে কাজ করে,যার ফলে দায়িত্ব যেমন বিভক্ত,তেমনি জবাবদিহিতাও অস্পষ্ট। বহু বছর ধরে এই সমন্বয়ের কথা বলা হলেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।
তাই এখন শুধু সমন্বয়ের কথা বলার সময় হয়তো পেরিয়ে গেছে। প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও স্বায়ত্তশাসিত নগর কর্তৃপক্ষ,যার হাতে থাকবে পরিকল্পনা,বাস্তবায়ন এবং তদারকির পূর্ণ দায়িত্ব। এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে আইনি ক্ষমতা দিতে হবে,যাতে কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা তার কাজে অযথা হস্তক্ষেপ করতে না পারে।
এই কর্তৃপক্ষের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত নগরীর প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধার করা। একসময় চট্টগ্রামের বুক চিরে বয়ে যাওয়া অসংখ্য খাল আজ দখল,ভরাট এবং অব্যবস্থাপনায় তাদের অস্তিত্ব হারিয়েছে। অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে খালগুলোকে আগের প্রস্থ ও গভীরতায় ফিরিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে কর্ণফুলী ও হালদা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত প্রতিটি খালের মুখে আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় স্লুইসগেট নির্মাণ করতে হবে,যাতে জোয়ারের পানি শহরে ঢুকতে না পারে এবং ভাটার সময় জমে থাকা পানি দ্রুত নদীতে নেমে যেতে পারে।
পাশাপাশি চট্টগ্রামের পাহাড় জলাধার এবং প্রাকৃতিক জলাধারণ ক্ষমতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। অপরিকল্পিত পাহাড় কাটার ফলে বর্ষার পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বালু ও কাদা নালায় জমে জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এই অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে আধুনিক নগর পরিকল্পনার আলোকে পুরো ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক নতুন করে সাজাতে হবে,যাতে বৃষ্টির পানি দ্রুত প্রধান খালগুলোতে পৌঁছাতে পারে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও আধুনিক করতে হবে,কারণ পলিথিন ও প্লাস্টিকের কারণে নালা-নর্দমা বন্ধ হয়ে যাওয়াও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ।
তবে প্রযুক্তিগত সমাধানের চেয়েও বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কারণ খাল দখল,পাহাড় কাটা কিংবা জলাধার ভরাটের সঙ্গে প্রায়ই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা থাকে। তাদের সবারই রাজনৈতিক পরিচয় আছে,ক্ষমতার কাঠামোয় প্রভাব আছে। ফলে আইন প্রয়োগের উদ্যোগ অনেক সময় শুরু হওয়ার আগেই থেমে যায়। এই বাস্তবতা পরিবর্তন না হলে শত শত কোটি টাকার প্রকল্পও কাগজে সফল হলেও বাস্তবে নাগরিক দুর্ভোগ কমাতে পারবে না।
চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই শহর শুধু একটি বন্দর নয়;এটি দেশের শিল্প,আমদানি-রপ্তানি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। তাই চট্টগ্রামকে বাঁচানো মানে দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা। আর যদি সত্যিই চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে হয়,তাহলে আর নতুন নতুন প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা,শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান,আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সাহস। অন্যথায় প্রতি বর্ষায় একই দৃশ্য ফিরে আসবে,আর 'বাণিজ্যিক রাজধানী' কথাটি কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতার অলংকার হয়েই থেকে যাবে।
Comments