অর্থাভাবে সদর দপ্তর লিজ দিতে চায় ন্যাশনাল ব্যাংক
চরম আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে নতুন আয়ের উৎস তৈরি করতে ঢাকার পান্থপথে নির্মাণাধীন সদর দপ্তরের দুটি টাওয়ারের মধ্যে একটি বাণিজ্যিকভাবে লিজ দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের অনুমতি চেয়েছে প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংক।
ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, জুন মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ন্যাশনাল ব্যাংক তাদের প্রস্তাবিত 'এনবিএল টুইন টাওয়ার' প্রকল্পের টাওয়ার-২ লিজ দেওয়ার অনুমতি চেয়েছে। ব্যাংকটির যুক্তি, ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পর দুটি টাওয়ারই কেবল নিজস্ব কার্যক্রমে ব্যবহার করা আর্থিকভাবে লাভজনক হবে না।
ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় স্থাবর সম্পত্তির মালিক হতে পারে। তবে নিজস্ব ব্যবহারের জন্য নির্মিত ভবন বাণিজ্যিকভাবে লিজ দিয়ে আয় করার অনুমতি নেই।
ব্যাংকটির দুর্বল আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে গত ২৯ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারকে আইনের সংশ্লিষ্ট বিধান থেকে ন্যাশনাল ব্যাংককে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশে বলা হয়েছে, সদর দপ্তর নির্মাণ প্রকল্পটি মূলত এই শর্তে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল যে এটি শুধু ব্যাংকের নিজস্ব কার্যক্রমে ব্যবহৃত হবে। তবে বর্তমানে ব্যাংকটি আর্থিক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় পরিচালনা পর্ষদ টাওয়ার-২ লিজ দিয়ে টেকসই অ-তহবিলভিত্তিক (নন-ফান্ডেড) আয় সৃষ্টি, স্থায়ী সম্পদের ওপর আয় বৃদ্ধি এবং ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার প্রস্তাব দিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও উল্লেখ করেছে, এ প্রস্তাব অনুমোদন পেলে পরিচালনা পর্ষদের পুনর্গঠন, তারল্য সহায়তা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা ও আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের চলমান সংস্কার কার্যক্রমে সহায়ক হবে।
এ ছাড়া, ন্যাশনাল ব্যাংক স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগের আইনগত সীমাও অতিক্রম করেছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগ তার মূলধনভিত্তির ৩০ শতাংশের বেশি হতে পারে না।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে পান্থপথে ৬৪ কাঠা জমির ওপর টুইন টাওয়ার প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। প্রকল্পে তিনটি বেজমেন্টসহ দুটি ১২ তলা টাওয়ার রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার হিরিম প্রকল্পটির নকশা প্রণয়ন করে। নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় দক্ষিণ কোরিয়ার ডোঙ্গা এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠান এমএস কনস্ট্রাকশন।
ব্যাংকের সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত টাওয়ার-১-এর নির্মাণকাজ ধীরগতিতে চলছে, কারণ প্রকল্পে ধাপে ধাপে অর্থ ছাড় করা হচ্ছে। অন্যদিকে, টাওয়ার-২-এর কাঠামোগত নির্মাণ শেষ হলেও সমাপ্তি পর্যায়ের কাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে।
বর্তমান আইন অনুযায়ী, নিজস্ব ব্যবহারের জন্য নির্মিত অফিস ভবন বাণিজ্যিকভাবে লিজ দিয়ে ব্যাংকগুলো ভাড়া বাবদ আয় করতে পারে না। ব্যাংক কোম্পানি আইন ব্যাংকিং কার্যক্রমের পরিধি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছে এবং সদর দপ্তরের ভবন বাণিজ্যিকভাবে লিজ দেওয়া সেই পরিধির মধ্যে পড়ে না।
দেশের সবচেয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলোর একটি হিসেবে রয়ে গেছে ন্যাশনাল ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চ মাসের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ, যার পরিমাণ প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা, খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। এর অধিকাংশই মন্দ ঋণ হিসেবে শ্রেণিকৃত।
এ ছাড়া, ব্যাংকটির প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি ছিল। একই সময়ে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিআরএআর) ছিল ঋণাত্মক ৬ দশমিক ১১ শতাংশ, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫ শতাংশের তুলনায় অনেক কম।
বছরের পর বছর দুর্বল সুশাসন ও ব্যাপক ঋণ অনিয়মের কারণেই এ সংকট তৈরি হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সিকদার গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসহ প্রভাবশালী কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বছরের পর বছর ব্যাংকটি থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিলেও সেই অর্থের বড় অংশ আর ফেরত আসেনি। ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়ে গিয়ে প্রভিশন ও মূলধনে বড় ঘাটতি সৃষ্টি করেছে এবং শেষ পর্যন্ত ব্যাংকটিকে বর্তমান আর্থিক সংকটে ঠেলে দিয়েছে।
Comments