গুমের শিকার পরিবারগুলোর জন্য এই বাজেটেই ভাতার ব্যবস্থা করব: মির্জা ফখরুল
বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও যোদ্ধাদের মতো গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারকেও রাষ্ট্রীয়ভাবে ভাতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি জানিয়েছেন, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সহায়তায় আগামী অর্থবছরের বাজেটেই প্রয়োজনীয় বরাদ্দের (প্রভিশন) ব্যবস্থা করবে সরকার।
শুক্রবার (২৬ জুন) দুপুরে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে 'প্রতিকার ও পুনর্বাসনের অধিকার' শীর্ষক এক জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই প্রতিশ্রুতি দেন। জাতিসংঘ ঘোষিত 'নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক দিবস ২০২৬' উপলক্ষে হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (এইচআরডিসি) ও 'মায়ের ডাক' যৌথভাবে এই মেলার আয়োজন করে।
সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গুমের ঘটনাকে চরম মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, "বারবার বলেছি, যদি মুক্তিযোদ্ধাদের ও জুলাই যোদ্ধাদের ভাতা দেওয়া হয়, তবে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারকে কেন দেওয়া হবে না? অবশ্যই দিতে হবে। রাষ্ট্র এই ক্ষতি পুরোপুরি পূরণ করতে না পারলেও পাশে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণের ব্যবস্থা করতে পারে।"
সাবেক আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সবচেয়ে ভয়াবহ লোক সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান ধরা পড়েছে এবং তার বিচার হচ্ছে। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদও দুবাইয়ে ধরা পড়েছে। তাদের যে দম্ভ ছিল, আজ আল্লাহ তাদের আদালতের সামনে হাজির করেছেন। একে একে সব অপরাধী ধরা পড়বে। গুম ও নির্যাতনকে রাজনৈতিকভাবে না দেখে সবাই মিলে এর প্রতিকার করতে হবে এবং ভুক্তভোগীদের হাতে আইনের শক্তি তুলে দিতে হবে।
সংলাপে ২০১৩ সালে গুম হওয়া গাড়িচালক কাওসার হোসেনের মেয়ে লামিয়া আক্তার মীম তাঁর মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। মাত্র তিন বছর বয়সে বাবাকে হারানো মীম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "বাবার কোনো স্মৃতি আমার মনে নেই, শুধু একটা ছবি ছাড়া। বাবা জীবিত না মৃত তাও জানি না। অন্তত একটা কবর থাকলেও গিয়ে দাঁড়াতে পারতাম, আমাদের তাও নেই।"
২০২৫ সালের ৫ জুন 'আয়নাঘর' পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, সেখানকার 'কবর সেল' বা ছোট কুঠুরিগুলো এতটাই ভয়াবহ যে একজন সুস্থ মানুষ ৫ মিনিটে অসুস্থ হয়ে যাবে। তিনি এই চরম নির্যাতনের পেছনে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন।
আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের আমলে দীর্ঘদিন গুমের শিকার থাকা ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম সংলাপে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষে তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরেন: ১. গুমের ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ভুক্তভোগীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। ২. ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য স্থায়ী পুনর্বাসন ও মাসিক বা এককালীন আর্থিক ভাতা। ৩. ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন এবং 'জুলাই জাদুঘর'কে সংরক্ষণ করা।
তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, "১৬ বছরের স্বৈরাচারে ভুক্তভোগীরা নিজ দেশেই উদ্বাস্তু ছিল। বাংলার মাটিতে আমরা আর কোনোদিন ফ্যাসিবাদের কার্যক্রম ফিরে আসতে দেব না।"
সংলাপে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরে বলেন, বিগত বছরগুলোতে বুড়িগঙ্গা নদী দিয়ে ভেসে যাওয়া অনেক গুলিবিদ্ধ লাশ মুন্সিগঞ্জ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। গুম হওয়া ব্যক্তিদের অনেককে সেখানে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তাই উদ্ধার করা লাশগুলোর সংরক্ষিত ডিএনএ নমুনার সাথে নিখোঁজ পরিবারগুলোর ডিএনএ মিলিয়ে দেখার জোর দাবি জানান তিনি।
সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলির স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংলাপে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এবং কানাডার ইউনিভার্সিটি অব রেজাইনার অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ। সংলাপে দেশের বরেণ্য আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী এবং গুম ও নির্যাতনের শিকার পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন।
Comments