মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: আশার চেয়ে অনিশ্চয়তাই বেশি
বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু সীমিত শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগের কারণে দেশের অভ্যন্তরে সবার জন্য পর্যাপ্ত কাজের ব্যবস্থা করা সহজ নয়। এ বাস্তবতায় বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি শুধু একটি সামাজিক প্রয়োজন নয়, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে দ্রুত শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার আহ্বান নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ।
মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি ও সেবা খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে নব্বইয়ের দশক থেকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য যতদিন খোলা ছিল, তার চেয়ে বেশি সময় বন্ধ ছিল। ফলে হাজার হাজার কর্মপ্রত্যাশী বিদেশে কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো ২০০৯ সালে বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০১৫ সালে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হলে ২০১৬ সালে আবার কর্মী পাঠানো শুরু হয়। কিন্তু মাত্র দুই বছর পর ২০১৮ সালে সেই প্রক্রিয়া আবার বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ২০২২ সালের আগস্ট থেকে কর্মী পাঠানো পুনরায় শুরু হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের মে মাসে আবারও তা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে শ্রমবাজারটি বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য কার্যত বন্ধ রয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে। কারণ এর মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হবে। দ্রুত সংশোধন না হলে নতুন করে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ হতে পারে। ফলে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যেতে পারে। তাই উভয় দেশের উচিত দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করে শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা।
প্রশ্ন হলো, কেন শুধুমাত্র বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই বারবার এই সমস্যা সৃষ্টি হয়? মালয়েশিয়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শ্রমিক নিয়োগ করে থাকে। বর্তমানে ১৪টি দেশ থেকে তারা কর্মী নেয়। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ থাকলেও বাকি ১৩টি দেশের ক্ষেত্রে নিয়োগ কার্যক্রম সচল থাকে। এটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে সমস্যাটি শ্রমিকের চাহিদা নয়, বরং নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিয়ম ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত।
দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে যে দুই দেশের জনশক্তি রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যবসায়ী, দালাল ও অসাধু আমলাদের সিন্ডিকেট নিয়োগ প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এর ফলে কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ভুয়া চাকরির প্রতিশ্রুতি এবং বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা সংঘটিত হয়েছে। ২০২২ সালে কর্মী পাঠানোর সময় সরকারিভাবে একজন কর্মীর ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাস্তবে অনেক কর্মীর কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকারও বেশি আদায় করা হয়েছে। ফলে বিদেশে যাওয়ার আগেই তারা ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েন।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক শ্রমিক এত বিপুল অর্থ ব্যয় করে মালয়েশিয়ায় গিয়েও প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া চাহিদাপত্র দেখিয়ে তাদের পাঠানো হয়েছে। ফলে তারা বেকার অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছেন। এই ধরনের অনিয়ম শুধু শ্রমিকদের ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকেও ক্ষুণ্ন করে।
এছাড়া মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অনিয়মিত বা অবৈধ বাংলাদেশি শ্রমিকদের সমস্যাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় তারা সবসময় গ্রেপ্তার, জরিমানা কিংবা বহিষ্কারের ঝুঁকিতে থাকেন। অনেকেই শ্রমিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন এবং শোষণের শিকার হন। তাই তাদের বৈধকরণের জন্য একটি মানবিক ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে বিভিন্ন কারণে আটক বাংলাদেশিদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস। প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখে। ফলে এই শ্রমবাজারকে সুরক্ষিত রাখা এবং সম্প্রসারণ করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক উদ্যোগ দুই দেশের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে শুধু আলোচনা নয়, এর বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো এবং শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে।
সর্বোপরি, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়া বাংলাদেশের লাখো কর্মপ্রত্যাশী তরুণের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার মাধ্যমে যদি শ্রম অভিবাসন ব্যবস্থাকে পরিচালিত করা যায়, তাহলে তা শুধু বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে না, বরং দেশের অর্থনীতিকেও নতুন গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
Comments