সিএমপিতে আড়াই কোটি টাকার ইয়াবা গায়েব: নেপথ্যে ওসি আফতাব!
দেশের মাদকবিরোধী অভিযানে যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জিরো টলারেন্স নীতি চলছে, ঠিক তখনই চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশে (সিএমপি) ঘটে যাওয়া এক নজিরবিহীন ও উদ্বেগজনক ঘটনা সামনে এসেছে। কক্সবাজার থেকে ঢাকায় পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া এক লাখ পিস ইয়াবা বড়ি উদ্ধারের পর তা সরকারি মালখানায় জমা বা মামলা রুজু না করে সরাসরি আত্মসাত করার অভিযোগ উঠেছে খোদ পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে। আরও গুরুতর বিষয় হলো, বিপুল সংখ্যক মাদকসহ হাতেনাতে আটক হওয়া এক পুলিশ কনস্টেবলকে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নির্দেশে কোনো আইনি ব্যবস্থা ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো নিয়মিত মামলা দায়ের হয়নি, উদ্ধার হয়নি আড়াই কোটি টাকার সেই ইয়াবাও।
সিএমপির অভ্যন্তরীণ এক উচ্চপর্যায়ের তদন্তে এই বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে, যা পুলিশের জবাবদিহি ও পেশাগত সততাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার সুস্পষ্ট সুপারিশ করা হলেও মূল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কঠোর পদক্ষেপ না থাকায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনার শুরু গত বছরের ৮ ডিসেম্বর। কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী 'দেশ ট্রাভেলস' পরিবহনের (ঢাকা মেট্রো-ব ১৫-১৬৪২) একটি দূরপাল্লার বাসে করে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা পাচার করা হচ্ছিল। বাসটি চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া এলাকার শাহ আমানত সেতু পার হওয়ার পর তল্লাশি চৌকিতে থামানো হয়। সেখানে দায়িত্বরত বাকলিয়া থানার এএসআই সাদ্দাম হোসেন ও এক পুলিশ সোর্স বাসে উঠে ঘুমন্ত এক যাত্রীকে জাগিয়ে তোলেন। পরিচয় জানতে চাইলে ওই যাত্রী নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন এবং পরিচয়পত্র দেখান। পরে তাকে এবং তার লাগেজটি বাস থেকে নামিয়ে পুলিশ বক্সে নেওয়া হয়। বাসের সুপারভাইজার মো. মিজান বিষয়টি দেখতে গেলে এস আই আমির হোসেন তাকে বাস নিয়ে চলে যেতে বলেন। এরপর চালক মো. সুলতান বাসটি নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য-প্রমাণের পথ সেখানেই বন্ধ হয়ে যায়।
ঘটনাটি দীর্ঘদিন ধামাচাপা থাকলেও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অডিও কল রেকর্ড ভাইরাল হয়। সেখানে ইয়াবাসহ আটক ব্যক্তি ও অন্য এক ব্যক্তির কথোপকথন ফাঁসের পর সিএমপি প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠনে বাধ্য হয়। অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি দীর্ঘ তদন্ত, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ২৯ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরে ৬ পৃষ্ঠার একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাদকসহ আটক হওয়া ওই পুলিশ সদস্যের নাম ইমতিয়াজ হোসেন। তিনি সে সময় কক্সবাজার জেলা আদালতের এক বিচারকের গানম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কক্সবাজারের মোশাররফ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ইয়াবাভর্তি লাগেজটি নিয়ে ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে বাহক হিসেবে তিনি ঢাকায় যাচ্ছিলেন।
পুলিশ বক্সে লাগেজটি খোলার পর সেখানে ১০টি প্যাকেটে ১০ হাজার করে মোট ১ লাখ পিস ইয়াবা বড়ি পাওয়া যায়, যার আনুমানিক বাজার দাম প্রায় আড়াই কোটি টাকা। জিজ্ঞাসাবাদের সময় ইমতিয়াজ নিজের মুক্তির জন্য অনুনয়-বিনয় করলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন। এরপর ইয়াবার প্যাকেটগুলো নিজেদের হেফাজতে রেখে ইমতিয়াজকে তাঁর ব্যক্তিগত মালামালসহ কোনো প্রকার আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে বেরিয়ে ইমতিয়াজ একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে অলংকার মোড় হয়ে কুমিল্লায় তার গ্রামের বাড়িতে চলে যান।
তদন্ত প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুতর অংশে উল্লেখ করা হয়েছে, এই পুরো অবৈধ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছিল বাকলিয়া থানার তৎকালীন ওসি আফতাব উদ্দিনের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৪৬ ধারা অনুযায়ী এটি একটি আমলযোগ্য অপরাধ হওয়ায় মামলা করা আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু ওসি মামলা গ্রহণ না করে বাংলাদেশ পুলিশ প্রবিধানমালা (পিআরবি)-এর ২৪৪ বিধি এবং পুলিশ আইনের ২৯ ধারা লঙ্ঘন করেছেন। শুধু তাই নয়, অপরাধ লুকাতে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজও সংরক্ষণ করা হয়নি।
তদন্তে ওসির নির্দেশে আসামি ছেড়ে দেওয়ার কারণে তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদসহ আরও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সরাসরি সম্পৃক্ততা ও তথ্য গোপনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনসহ এস আই আল-আমিন সরকার, এস আই আমির হোসেন, এ এস আই সাদ্দাম হোসেন, এ এস আই সাইফুল আলম, এ এস আই জিয়াউর রহমান, এ এস আই এনামুল হক (ওসি আফতাবের আপন ভাগিনা), কনস্টেবল রাশেদুল হাসান এবং কনস্টেবল উম্মে হাবিবা স্বপ্নাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সর্বশেষ গত ৯ জুন পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদকেও সাময়িক বরখাস্ত করেন আইজিপি।
তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঘটনার মূল হোতা হিসেবে প্রতিবেদনে যার নাম এসেছে, সেই তৎকালীন ওসি আফতাব উদ্দিন শেখের বিরুদ্ধে এখনও কোনো দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো তিনি বর্তমানে নগরীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোতোয়ালি থানার ওসির দায়িত্বে রয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে আফতাব উদ্দিন শেখ তার বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, 'ইয়াবার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি আত্মসাৎ করিনি। ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম'।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার এই ঘটনাকে অত্যন্ত বিরল ও গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, উদ্ধার হওয়া মাদক কোথায় গেল এবং কেন এফআইআর ও জব্দ তালিকা করা হলো না, এর পেছনে কোনো সংগঠিত অপরাধচক্র বা আর্থিক লেনদেন আছে কি না তা গভীরভাবে উদ্ঘাটন করা জরুরি।
তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই সিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (পশ্চিম) আবদুল্লাহ মোহাম্মদ শেখ সাদী আট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার তদন্ত কার্যক্রম চালাচ্ছেন।
এদিকে সদ্য দায়িত্ব নেওয়া চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী এ প্রসঙ্গে তার কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, 'এক লাখ ইয়াবা গায়েব হওয়ার পরও কেন এত দিন নিয়মিত মামলা হয়নি, তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান জিরো টলারেন্স'।
Comments