তেল বিক্রির কূটনীতিতে কি ভারত সফরে রুবিও?
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা আর বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যে ভারত সফরে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। বিশ্লেষকদের মতে, চার দিনের এই সফরের অন্যতম বড় লক্ষ্য- ভারতের কাছে আরও বেশি মার্কিন তেল ও গ্যাস বিক্রি করা।
শনিবার শুরু হওয়া সফরে রুবিওর দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। তবে কূটনৈতিক আলোচনার আড়ালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে জ্বালানি নিরাপত্তা।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানকে ঘিরে সংকট নতুন মাত্রা পায়। এর জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ইরান প্রণালিটি কার্যত চাপ প্রয়োগের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে থাকা দেশগুলোর একটি ভারত। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক দেশটি নিজেদের প্রয়োজনের ৮০ শতাংশের বেশি তেল ও গ্যাস বিদেশ থেকে আমদানি করে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সামান্য অস্থিরতাও সরাসরি প্রভাব ফেলে ভারতের অর্থনীতিতে।
এমন বাস্তবতায় ওয়াশিংটন এখন সুযোগ দেখছে। সফরের আগে রুবিও প্রকাশ্যেই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় ভারত যত বেশি সম্ভব মার্কিন জ্বালানি কিনুক। তার ভাষ্য, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র 'ঐতিহাসিক' মাত্রায় তেল ও গ্যাস উৎপাদন করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু বাণিজ্যের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভূরাজনীতি ও কৌশলগত হিসাবও। ভারত দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ইরান যুদ্ধ এবং রুশ তেল নিয়ে পশ্চিমা চাপের কারণে দিল্লি এখন বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। সেই জায়গাতেই নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে ওয়াশিংটন।
দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিনীত প্রকাশ বলেন, 'এই সফরের মূল বিষয়ই হচ্ছে জ্বালানি। যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারছে, ইরান সংকট দ্রুত শেষ হচ্ছে না। তাই তারা ভারতের বাজারে নিজেদের তেল ও গ্যাসের উপস্থিতি বাড়াতে চাইছে।'
তবে বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারত পর্যন্ত জ্বালানি পরিবহন ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় দূরত্বও অনেক বেশি। ফলে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, মার্কিন তেল দিয়ে পুরো ঘাটতি পূরণ করা ভারতের জন্য সহজ হবে না।
তারপরও ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে ভারত এখন বড় কৌশলগত বাজার। ২০২৫ সালে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ৫৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। তাই ভারত যদি আরও বেশি মার্কিন জ্বালানি আমদানি করে, তবে তা ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক লক্ষ্য পূরণেও সহায়ক হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন শুধু সামরিক সংঘাতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিকেও নতুনভাবে প্রভাবিত করছে। সেই প্রেক্ষাপটে রুবিওর ভারত সফরকে 'তেল কূটনীতি'র অংশ হিসেবেই দেখছেন অনেকে।
Comments