রামিসা হত্যার বিচার কি হবে?
"আমি বিচার চাই না। কারণ,আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই।"
রামিসা আক্তারের বাবার এই কথাগুলো শুধু একজন শোকাহত পিতার হতাশা নয়;এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর অনাস্থার নগ্ন স্বীকারোক্তি। একটি রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা আর কী হতে পারে, যেখানে নাগরিক অপরাধের চেয়ে বিচারহীনতাকেই বেশি নিশ্চিত মনে করে।
ঢাকার পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড দেশকে আবারও নাড়িয়ে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উত্তাল,সংবাদমাধ্যম সরব,প্রশাসনের আশ্বাসও এসেছে যথারীতি, "দ্রুত বিচার হবে।" কিন্তু এই আশ্বাস এখন আর মানুষের মনে ভরসা জাগায় না। কারণ,মানুষ জানে এই দেশে বিচার মানে দীর্ঘ অপেক্ষা,অনিশ্চয়তা,আর শেষ পর্যন্ত ধীরে ধীরে সবকিছু ধামাচাপা পড়ে যাওয়া।
এই অবিশ্বাসের পেছনে কারণও আছে। মাত্র এক বছর আগেই মাগুরার আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণ-হত্যার ঘটনা সারা দেশে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলার কার্যক্রমও হয়েছিল। মৃত্যুদণ্ডের রায়ও ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তারপর? এক বছর পার হলেও সেই রায় কার্যকর হয়নি। মামলাটি উচ্চ আদালতের জটিল প্রক্রিয়ায় ঝুলে আছে। ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য প্রতিটি দিন যেন নতুন এক মানসিক নির্যাতন।
বাংলাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি নতুন নয়। বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোতে আমরা প্রায় একই চিত্র দেখা যায়। প্রথমে ব্যাপক জনরোষ,এরপর রাজনৈতিক বক্তব্য,তারপর ধীর তদন্ত,দীর্ঘসূত্রতা,সাক্ষীর অনুপস্থিতি,প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ,এবং একসময় মানুষের আগ্রহ কমে যাওয়া। তখন মামলাগুলো কাগজের ফাইলে বন্দি হয়ে পড়ে থাকে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো,এই বিচারহীনতা অপরাধীদের সাহস জোগায়। যখন একজন ধর্ষক বা খুনি দেখে যে কয়েক মাস পর মানুষ সব ভুলে যায়,আদালতের প্রক্রিয়া বছরের পর বছর চলে,আর শেষ পর্যন্ত অনেকেই জামিনে বেরিয়ে আসে। তখন তার মধ্যে ভয় নয়,বরং এক ধরনের নিশ্চিন্ততা তৈরি হয়।
২০১৬ সালের শিশু পূজার ঘটনাটি তার নির্মম উদাহরণ। যে শিশুটির ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে তার যৌনাঙ্গ ব্লেড দিয়ে কেটে দেওয়া হয়েছিল,সেই মামলার আসামি যাবজ্জীবন দণ্ড পাওয়ার পরও পরে জামিনে মুক্তি পেয়েছে। এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের ক্ষতকে নতুন করে জাগিয়ে তোলেনি;এটি পুরো সমাজকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে বিচারব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর।
সমস্যা শুধু আইনের দুর্বলতা নয়;সমস্যার গভীরে আছে বিচারপ্রক্রিয়ার অমানবিক কাঠামো। ধর্ষণ বা হত্যার শিকার পরিবারের জন্য আদালতের পথ যেন আরেকটি শাস্তি। বারবার আদালতে যাওয়া, কুৎসিত জেরা,সামাজিক অপমান,আর্থিক চাপ,প্রশাসনিক হয়রানি - সব মিলিয়ে পরিবারগুলো মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। অনেক সময় দেখা যায়,আসামির চেয়ে ভুক্তভোগীর পরিবারকেই বেশি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।
এমন বাস্তবতায় সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যায়। কারণ তারা বুঝে যায় প্রতিবাদ করে খুব বেশি লাভ নেই। কিছুদিন পর আরেকটি নতুন ঘটনা আসবে,পুরোনো ঘটনা চাপা পড়ে যাবে। এই চক্রটাই এখন বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অবস্থার দায় কার? শুধুই বিচারব্যবস্থার? নাকি পুরো রাষ্ট্র ও সমাজের?
রাষ্ট্রের দায় অবশ্যই সবচেয়ে বেশি। কারণ নাগরিকের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু একই সঙ্গে সমাজের ভেতরেও ভয়ংকর এক অসাড়তা তৈরি হয়েছে। শিশু নির্যাতনের খবর এখন আর মানুষকে দীর্ঘ সময় নাড়া দেয় না। কয়েকদিনের ক্ষোভ শেষে আমরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাই। সামাজিক চাপ ও জনমতের ধারাবাহিকতা না থাকলে বিচারপ্রক্রিয়াও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বাংলাদেশে বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, রাষ্ট্র চাইলে দ্রুত বিচার সম্ভব। কিন্তু সেই দ্রুততা সব মামলায় দেখা যায় না। ফলে মানুষ মনে করে, বিচারও যেন ক্ষমতা ও গুরুত্ব অনুযায়ী ভাগ হয়ে গেছে।
শুধু কঠোর শাস্তির আইন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন কার্যকর বিচার। একটি মামলা কত দ্রুত তদন্ত শেষ হবে, সাক্ষীর নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে,ভুক্তভোগী পরিবার কী ধরনের সহায়তা পাবে, এসব প্রশ্নের উত্তর না বদলালে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙা যাবে না।
শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়;এটি জাতীয় সংকট। যে দেশে একটি শিশু স্কুলে,মাদ্রাসায়,আত্মীয়ের বাসায় কিংবা নিজের ঘরেও নিরাপদ নয়,সে দেশের উন্নয়নের গল্প আসলে ভীষণ ভঙ্গুর।
রামিসার বাবার কথায় তাই পুরো সমাজের এক গভীর বেদনা ধরা পড়ে। তিনি হয়তো বিচার চান না বলেছিলেন ক্ষোভে। কিন্তু সত্য হলো,এই দেশের প্রতিটি মানুষ বিচার চায়। কারণ বিচার মানে শুধু একজন অপরাধীর শাস্তি নয়;বিচার মানে রাষ্ট্র এখনো বেঁচে আছে-এই বিশ্বাসটুকু ফিরে পাওয়া।
কিন্তু সেই প্রশ্ন এখনো বাতাসে ঝুলে আছে-বিচার কি হবে?
Comments