বেঁচে থাকার তাগিদে সন্তান বিক্রি করছেন আফগান পিতারা: বিবিসি
তালেবান শাসিত আফগানিস্তানে অর্থনৈতিক সংকট ও ক্ষুধার তীব্রতা দিন দিন চরম আকার ধারণ করছে। কর্মসংস্থানহীনতা আর তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে পড়ে অনেক বাবা বাধ্য হচ্ছেন নিজের কলিজার টুকরো সন্তানকে বিক্রি করার মতো নির্মম ও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির সাম্প্রতিক এক সরেজমিন প্রতিবেদনে আফগানিস্তানের এই ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক চিত্র উঠে এসেছে।
আফগানিস্তানের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশ 'ঘর'-এর রাজধানী চাঘচারানে প্রতিদিন ভোরে শত শত মানুষ কাজের খোঁজে এক ধুলোমাখা চত্বরে জড়ো হন। কিন্তু দিনশেষে অধিকাংশেরই কোনো কাজ জোটে না।
স্থানীয় বাসিন্দা জুমা খান নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন: "গত ছয় সপ্তাহে আমি মাত্র তিন দিন কাজ পেয়েছি। দিনে আয় মোটে ১৫০ থেকে ২০০ আফগানি (২.৩৫ - ৩.১৩ ডলার)। তিন রাত ধরে আমার সন্তানরা না খেয়ে ঘুমিয়েছে। স্ত্রী-সন্তানদের কান্না সইতে না পেরে প্রতিবেশীর কাছে টাকা ধার করেছি। প্রতিদিন এই ভয়ে থাকি— আমার সন্তানরা বোধহয় না খেয়েই মারা যাবে।"
একই প্রদেশের বাসিন্দা রাবানি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, সন্তানরা দুদিন না খেয়ে থাকার কষ্ট দেখতে না পেরে তিনি একপর্যায়ে আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলেন। অন্যদিকে, বয়সের কারণে কাজ না পাওয়া খোয়াজা আহমদ জানান, ক্ষুধার জ্বালায় ইতিমধ্যে তাঁর বড় সন্তানটি মারা গেছে। স্থানীয় বেকারির সামনে মাঝেমধ্যে দেওয়া শুকনো রুটির জন্য ক্ষুধার্ত মানুষের কাড়াকাড়ি ও প্রতিযোগিতা পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
প্রদেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে দারিদ্র্যের রূপ আরও ভয়াবহ। আবদুল রশিদ আজিমি নামের এক দরিদ্র পিতা জানান, ঋণের বোঝা এবং পরিবারের ক্ষুধা মেটাতে তিনি তাঁর দুই কন্যাকে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একটি মেয়ে বিক্রি করতে পারলে সেই অর্থ দিয়ে অন্তত কয়েক বছর বাকি পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে। তাঁর স্ত্রীর মতে, বর্তমানে পরিবারটিতে খাবার বলতে কেবল শুকনো রুটি আর গরম পানি।
আরেক আফগান পিতা সাঈদ আহমদ জানান, অসুস্থ মেয়ের চিকিৎসা করাতে না পেরে মাত্র পাঁচ বছর বয়সী কন্যাকে এক আত্মীয়ের কাছে ২ লাখ আফগানিতে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। চুক্তি অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ওই পরিবারের ছেলের সঙ্গেই মেয়েটির বিয়ে দেওয়া হবে।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, আফগানিস্তানে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের বিক্রি করার প্রবণতা অনেক বেশি। এর মূল কারণ, সামাজিকভাবে ছেলেদের ভবিষ্যৎ উপার্জনক্ষম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তা ছাড়া বর্তমান তালেবান শাসনে মেয়েদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় পরিবারগুলো মেয়েদের ভরণপোষণ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।
জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আফগানিস্তানের প্রতি চার জনের মধ্যে তিন জনই এখন তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। প্রায় ৪৭ লাখ (৪.৭ মিলিয়ন) মানুষ তীব্র দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।
দেশটির চিকিৎসাব্যবস্থাও এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়ার মুখে। হাসপাতালগুলোতে জরুরি ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে অপুষ্টিতে আক্রান্ত নবজাতকের সংখ্যা দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। অনেক পরিবার অর্থের অভাবে চিকিৎসা শেষ না করেই তাদের অসুস্থ শিশুকে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বর্তমান আফগানিস্তানে টিকে থাকার লড়াই এতটাই নির্মম হয়ে উঠেছে যে, অনেক অসচ্ছল মা-বাবার কাছে এখন একমাত্র বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে— সন্তানকে চোখের সামনে না খেয়ে মরতে দেখা, অথবা বেঁচে থাকার তাগিদে তাকে অন্যের কাছে বিক্রি করে দেওয়া।
Comments