ইতালিতে নিজের জীবন বাজি রেখে হামলাকারীকে রুখলেন বাংলাদেশি তরুণ ‘সাকু’
নিজের জীবন বাজি রেখে এক উন্মত্ত ও উগ্রপন্থি হামলাকারীকে রুখে দিয়ে ইতালিতে বীরের মর্যাদা পাচ্ছেন সাকু তালুকদার নামের ২১ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি তরুণ। শনিবার (১৬ মে) ইতালির মোডেনা (Modena) শহরের প্রাণকেন্দ্রে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী হামলা প্রতিরোধে অনন্য ভূমিকা রেখে এখন পুরো ইতালিতে প্রশংসায় ভাসছেন তিনি। দেশটির মূলধারার গণমাধ্যমগুলো তাকে 'বাঙালি হিরো' (Eroe Bengalese) আখ্যা দিয়েছে।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত : ইতালীয় জাতীয় পত্রিকা 'ইল রেস্তো দেল কার্লিনো' (Il Resto del Carlino)-সহ স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার বিকেলে মোডেনা শহরের প্রাণকেন্দ্র ভিয়া এমিলিয়া (Via Emilia) সড়কে ৩১ বছর বয়সী এক উগ্রপন্থি চালক আচমকা তার গাড়ি নিয়ে ফুটপাতে উঠে পড়ে। সে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে একের পর এক পথচারীকে চাপা দেয়। এই নৃশংস হামলায় বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন, যার মধ্যে এক ইতালীয় নারীর পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটে।
নিজের জীবন বাজি রেখে সাকুর প্রতিরোধ গাড়িটি দুর্ঘটনাকবলিত হওয়ার পর চালক একটি ধারাল ছুরি নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে আসে এবং পালানোর চেষ্টা করতে করতে বাকি পথচারীদের ওপর নতুন করে হামলার উদ্যেগ নেয়। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখে যখন চারপাশের মানুষ ভয়ে দিকবিদিক পালাচ্ছিলেন, তখন লুকা সিগনরেলি নামের এক ইতালীয় যুবক ওই হামলাকারীর পিছু নেন এবং তাকে জাপটে ধরেন।
কিন্তু উন্মত্ত ওই হামলাকারী লুকার বুকে ও মাথায় ছুরি দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে ওঠে। ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত বাংলাদেশি তরুণ সাকু তালুকদার সরাসরি হামলাকারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে উগ্রপন্থি ওই ব্যক্তির হাত থেকে ধারাল ছুরিটি কেড়ে নিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলেন এবং তাকে মাটিতে চেপে ধরে কাবু করতে সাহায্য করেন। পরবর্তীতে পুলিশ এসে হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করে।
ভয়াবহ এই ঘটনার পর ইতালীয় গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন ২১ বছর বয়সী সাহসী তরুণ সাকু তালুকদার। জানা গেছে, চার বছর আগে লিবিয়া হয়ে নৌকায় চড়ে অত্যন্ত বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়ে ল্যাম্পেডুসা দ্বীপ হয়ে ইতালিতে এসেছিলেন তিনি। সেই 'নৌকায় আসা' সাকুই আজ ইতালির মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে নায়ক।
সাক্ষাৎকারে সাকু তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন: "আমি আক্রমণকারীকে নিরস্ত্র করেছিলাম; আমাকে সাহায্য করতেই হতো। আমি যা করেছি, তা আবারও করব। অনেকে মনে করে সব বিদেশিরাই খারাপ; কিন্তু এটা সত্যি নয়।"
নিজের জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার পেছনে পারিবারিক শিক্ষার কথা উল্লেখ করে সাকু আরও বলেন: "আমার বাবা-মা আমাকে সবসময় মানুষকে সাহায্য করতে শিখিয়েছেন। তাঁরা যদি আজ আমার এই কাজের জন্য গর্বিত হন, তবেই আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হব।"
আহতদের পাশে মানবিক সাকু হামলাকারীকে আটক করার পরও সাকুর দায়িত্ব শেষ হয়নি। পুলিশ তাকে হেফাজতে নেওয়ার পর সাকু আবারও রক্তাক্ত ঘটনাস্থলে ফিরে যান। সেখানে রাস্তায় ছটফট করতে থাকা আহত ইতালীয় নাগরিকদের জন্য দ্রুত পানি নিয়ে আসেন এবং অ্যাম্বুলেন্স ও উদ্ধারকর্মী না আসা পর্যন্ত তাদের প্রাথমিক সেবা দিয়ে শান্ত রাখার চেষ্টা করেন।
ইতালিতে ব্যাপক প্রশংসা ও সম্মান সাকুর এই অসামান্য বীরত্বের পর ইতালির শীর্ষস্থানীয় টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তার ছবি ও সাহসিকতার গল্প ব্রেকিং নিউজ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। সাধারণ ইতালীয় নাগরিক থেকে শুরু করে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা সাকু ও ইতালীয় যুবক লুকার এই যৌথ সাহসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করছেন।
স্থায়ীভাবে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে একটি বড় বার্তা দেওয়া এই বাংলাদেশি তরুণ প্রমাণ করেছেন, সততা ও সাহসিকতার কোনো সীমানা বা জাতীয়তা হয় না। নিজের জীবন বাজি রেখে অন্য দেশের নাগরিকদের প্রাণ বাঁচানোর এই অবিশ্বাস্য দৃষ্টান্ত ইউরোপের বুকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভাবমূর্তি ও সম্মান বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
Comments