রাজনৈতিক কাজে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থায়ন, সাবেক গভর্নর আহসান মনসুর জবাব দিবেন কি?
রাজনীতির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থের সম্পর্ক সবসময়ই সংবেদনশীল। বিশেষ করে যখন সেই অর্থের উৎস একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক-যার মূল দায়িত্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা করা, তখন বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বের দাবি রাখে। সাম্প্রতিক অভিযোগ অনুযায়ী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামে একটি অনিবন্ধিত সংগঠন গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোটের পক্ষে প্রচারণার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এক কোটি টাকা পেয়েছে। তারা নিজেরাই বলছে যে, কথা ছিল ৫ কোটি দিবে, তবে সময় স্বল্পতার কারণে ১ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। এই দাবি নিঃসন্দেহে জনমনে বিস্ময়, সন্দেহ এবং উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।
এটি কি আদৌ সম্ভব? একটি অনিবন্ধিত সংগঠন সরাসরি রাষ্ট্রীয় আর্থিক সহায়তা পেতে পারে না, এটি প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামোর একটি মৌলিক নীতি। অভিযোগ অনুযায়ী, এই সীমাবদ্ধতা পাশ কাটাতে দ্রুত 'স্যাড' নামে একটি ফাউন্ডেশন নিবন্ধন করা হয় এবং সেই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করা হয়। যদি তা সত্য হয়ে থাকে, তাহলে এটি কেবল একটি প্রশাসনিক ফাঁকফোকর ব্যবহার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার নৈতিকতার প্রশ্নও সামনে আনে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-অভিযোগের উৎস নিজ সংগঠনের ভেতর থেকেই এসেছে। সংগঠনের একাংশের নেতারা দাবি করছেন, শীর্ষ নেতৃত্ব এই অর্থ প্রাপ্তি এবং ব্যয়ের বিষয়টি গোপন করেছে। অর্থাৎ, প্রশ্নটি কেবল অর্থের উৎস নিয়ে নয়, বরং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়েও। একটি আন্দোলন, যার মূল স্লোগান বৈষম্যের বিরুদ্ধে, সেই আন্দোলনের ভেতরেই যদি আর্থিক অস্বচ্ছতা থাকে, তাহলে তা আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত নেতারা অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন এবং এটিকে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, গণভোটের প্রচারণার জন্য তহবিল সংগ্রহের প্রয়োজন ছিল এবং কিছু শুভাকাঙ্ক্ষীর পরামর্শে তারা একটি বৈধ কাঠামোর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়। এখানে "বৈধতা" এবং "নৈতিকতা"-এই দুইয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কিছু আইনের ফাঁক দিয়ে সম্ভব হলেও তা সবসময় নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয় না।
কেবল ছাত্রদের সংগঠনই নয় গণভোটে 'হ্যাঁ'-এর পক্ষে প্রচার চালাতে আরও অনেকগুলো সংগঠন বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকগুলোর সিএসআর তহবিল থেকে টাকা পায়। এর মধ্যে রয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে নানা দায়িত্ব পাওয়া বদিউল আলম মজুমদারের সংগঠনও। 'সুশাসনের জন্য নাগরিক' বা 'সুজন'কে আড়াই কোটি টাকার অনুদান দেওয়া হয়েছে। এ তহবিল থেকে ২০ লাখ টাকা অনুদান পায় বিতর্ক সংগঠন 'ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি'।
ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন 'অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ' বা 'এবিবি' চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন দৈনিক বণিক বার্তাকে বলেছেন,'এবিবির পক্ষ থেকে সুজন ও ডিবেট ফর ডেমোক্রেসিকে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে 'সুজন'কে। বাকি ২০ লাখ টাকা ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি'কে দেয়া হয়েছে। এ অর্থে 'হ্যাঁ' ভোটের প্রচার ও নির্বাচনী বিতর্ক আয়োজন করা হবে বলে আমাদের জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও পরামর্শেই আমরা এ টাকা দিয়েছি।'
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ হলো মুদ্রানীতি প্রণয়ন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক খাতের তদারকি করা। রাজনৈতিক বা আধা-রাজনৈতিক কার্যক্রমে অর্থায়ন করা তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। যদি সত্যিই এমন কোনো অর্থ প্রদান হয়ে থাকে, তাহলে তা প্রতিষ্ঠানটির নিরপেক্ষতা এবং পেশাগত অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এখানে আরও বড় একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। অভিযোগে বলা হচ্ছে, এই অর্থায়নের পেছনে তৎকালীন সরকার বা ক্ষমতাসীন মহলের নির্দেশনা ছিল। যদি তা হয়ে থাকে, তাহলে এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার একটি উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। ইতিহাস বলে, যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষতা হারায়, তখন গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে।
এছাড়া, একটি স্বল্প সময়ের প্রচারণার জন্য এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়, এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মাত্র সাত দিনের প্রচারণার জন্য এক কোটি টাকা-এটি কি যুক্তিযুক্ত? যদি এই পরিমাণ অর্থ সত্যিই ব্যয় হয়ে থাকে, তাহলে সেই ব্যয়ের খাতগুলো কী ছিল? কারা এই অর্থের সুবিধাভোগী? এবং একই ধরনের আরও কত অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে-এই প্রশ্নগুলো এখন সামনে আসা স্বাভাবিক।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-এই অর্থ জনগণের। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ মানে শেষ পর্যন্ত তা রাষ্ট্রের সম্পদ, যা জনগণের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কথা। সেই অর্থ যদি রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা জনগণের সঙ্গে এক ধরনের বিশ্বাসভঙ্গের সামিল।
এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর আহান এইচ মনসুরের জবাব দেওয়া। কেন তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকা, যা প্রকারান্তরে জনগণের টাকা, রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করতে দিলেন? কেন ব্যাংকগুলোকে দিতে নির্দেশ দিলেন? কেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির মতো সংগঠনকেও দিতে বললেন?
প্রয়োজন একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত। অভিযোগ সত্য বা মিথ্যা-উভয় ক্ষেত্রেই বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া জরুরি। কারণ, এটি কেবল একটি সংগঠন বা কয়েকজন নেতার প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন।
সবশেষে বলা যায়, এই ঘটনা আমাদের সামনে একটি বড় বাস্তবতা তুলে ধরেছে-রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং নাগরিক সমাজের সম্পর্ক এখনো সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত নয়। সেই সীমারেখা যতদিন অস্পষ্ট থাকবে, ততদিন এ ধরনের বিতর্ক ও সন্দেহ বারবার ফিরে আসবে। এখন সময় এসেছে, সেই সীমারেখা স্পষ্ট করার-আইনের মাধ্যমে, নীতির মাধ্যমে এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে।
এই ঘটনার আরেকটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে, যা কেবল একটি অভিযোগ বা পাল্টা অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে থাকা ক্ষমতার সম্পর্ক এবং প্রভাবের গতিপ্রকৃতিও সামনে নিয়ে আসে। একটি ছাত্র সংগঠন, তা সে যতই জনপ্রিয় বা প্রভাবশালী হোক না কেন, কীভাবে এত দ্রুত একটি ফাউন্ডেশন গড়ে তুলে রাষ্ট্রীয় আর্থিক সহায়তা পেতে পারে, সেটি নিছক কাকতালীয় বলে মনে করা কঠিন। এখানে স্পষ্টতই প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বা অন্তত প্রাতিষ্ঠানিক নীরব সম্মতির একটি প্রশ্ন উঠে আসে।
রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রায়ই দেখা যায়, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী নিজেদের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে বিভিন্ন সামাজিক বা নাগরিক সংগঠনকে ব্যবহার করে। তবে সেটি যদি সরাসরি রাষ্ট্রীয় অর্থের মাধ্যমে হয়, তাহলে তা একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। কারণ, এতে করে ভবিষ্যতে যে কোনো সরকার নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ অন্যান্য সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করার একটি পথ খুঁজে পেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাগত স্বাধীনতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এখানে গণভোটের প্রসঙ্গটিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি গণভোট মূলত জনগণের মতামত যাচাইয়ের একটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। কিন্তু যদি সেই গণভোটে এক পক্ষকে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের মাধ্যমে সুবিধা দেওয়া হয়, তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটির নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। জনগণের মতামত তখন আর স্বতঃস্ফূর্ত থাকে না; বরং তা প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়।
অন্যদিকে, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তরুণ নেতৃত্বের একটি অংশের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যারা পরিবর্তনের কথা বলে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তাদের কাছ থেকে স্বচ্ছতা এবং নৈতিকতার প্রত্যাশা আরও বেশি থাকে। কিন্তু যদি সেই নেতৃত্বের ভেতরেই তথ্য গোপন, অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং আর্থিক অস্বচ্ছতার অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ওপর আস্থাকে দুর্বল করে দেয়।
Comments