ঢাকাকে বাঁচাতে গ্রামে চলছে ভয়াবহ লোডশেডিং
গরমের সঙ্গে বাড়ছে বিদ্যুতের ঘাটতি। ঘাটতি মেটাতে নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে, যার প্রায় পুরোটাই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্রামের মানুষের ওপর। পরিকল্পনা করেই লোডশেডিংমুক্ত রাখা হচ্ছে ঢাকা শহরকে। তাই বলা যায়, 'গ্রাম অন্ধকারে, আলো শুধু ঢাকায়'।
এই কথাটি কেবল একটি সংবাদ শিরোনাম নয়, বরং বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থার গভীর বৈষম্যের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিদ্যুৎ সংকট আবারও প্রমাণ করেছে, উন্নয়নের আলো এখনো সমানভাবে পৌঁছায়নি সর্বত্র; রাজধানী উজ্জ্বল থাকলেও গ্রাম পড়ে আছে অন্ধকারে।
গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে যখন বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তখন উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। এই ঘাটতি পূরণে নিয়মিত লোডশেডিং করা হচ্ছে, কিন্তু এর বোঝা সমানভাবে ভাগ করা হচ্ছে না। বরং পরিকল্পিতভাবে রাজধানী ঢাকাকে লোডশেডিংমুক্ত রেখে গ্রামাঞ্চলে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার ভার।
ফলে দেখা যাচ্ছে, শহরের মানুষ যেখানে তুলনামূলক স্বস্তিতে দিন কাটাচ্ছে, সেখানে গ্রামের মানুষকে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশের অধিকাংশ গ্রাহক গ্রামে বসবাস করলেও বিদ্যুৎ সরবরাহে তারাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। একই সময়ে শহরের বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো প্রায় পূর্ণ চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাচ্ছে।
এই বৈষম্য শুধু জীবনযাত্রার মানের পার্থক্য তৈরি করছে না, বরং অর্থনীতির ওপরও বড় প্রভাব ফেলছে। গ্রামাঞ্চলে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে কৃষি উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ছোট শিল্প ও ব্যবসাগুলোও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে, বাড়ছে খরচ। অথচ শহরে এসব সমস্যার প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই বৈষম্য? এর একটি বড় কারণ হলো জ্বালানি সংকট এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে সীমাবদ্ধতা। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া, কয়লার ঘাটতি, এবং জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা—সব মিলিয়ে উৎপাদন কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানির অভাবে বন্ধ রয়েছে।
কিন্তু সমস্যা শুধু উৎপাদনের ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নীতিগত দুর্বলতা। দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনায় শহরকেন্দ্রিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ বণ্টনেও একই প্রবণতা দেখা যায়। রাজধানীকে সচল রাখতে গ্রামকে 'ত্যাগ' করা যেন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
এ ধরনের বৈষম্য সামাজিক ও মানসিক প্রভাবও ফেলছে। গ্রামে বসবাসকারী মানুষ নিজেদের অবহেলিত মনে করছে। তারা মনে করছে, দেশের উন্নয়ন তাদের জন্য নয়। এই অনুভূতি দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সমতাভিত্তিক লোডশেডিং হলে এই সংকট সবার জন্য সহনীয় হতে পারত। অর্থাৎ, শহর-গ্রাম নির্বিশেষে সমানভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমানো হলে কোনো একটি অঞ্চলকে অতিরিক্ত ভোগান্তির শিকার হতে হতো না।
সমাধানের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রথমত, জ্বালানির বিকল্প উৎস যেমন নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, গ্রামাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে তারা শুধু বিদ্যুৎ নয়, উন্নয়নের অন্যান্য সুবিধাও সমানভাবে পায়।
সবশেষে বলা যায়, একটি দেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা সবার জীবনে সমানভাবে প্রভাব ফেলে। যদি রাজধানী আলোকিত থাকে আর গ্রাম অন্ধকারে ডুবে থাকে, তবে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ। "গ্রাম অন্ধকারে, আলো শুধু ঢাকায়"-এই বাস্তবতা পরিবর্তন করাই এখন সময়ের দাবি।
Comments