এখন সংসদ সদস্যরা কি বাড়িও চাইবেন?
সম্প্রতি সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে -দেশের প্রতিটি উপজেলা পরিষদের দোতলায় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের জন্য এটাচ বাথরুম ও প্রয়োজনীয় আসবাবসহ একটি করে কক্ষ প্রস্তুত করা হবে। যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে,নির্বাচনী এলাকায় গেলে জনপ্রতিনিধিদের বসার একটি নির্দিষ্ট জায়গা থাকা উচিত। কিন্তু এই উদ্যোগকে ঘিরে নতুন এক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংসদ সদস্যদের ভূমিকা,দায়িত্ব এবং প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠছে্ ।
এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে যখন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ সংসদ সদস্যদের জন্য গাড়ির ব্যবস্থার দাবি জানান। তার বক্তব্য অনুযায়ী,উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বা উপজেলা চেয়ারম্যানদের গাড়ি থাকলেও সংসদ সদস্যদের ভাড়ায় গাড়ি ব্যবহার করতে হয়,যা তাদের জন্য বিব্রতকর।অথচ নেট দুনিয়ায় তার বক্তব্য ঘুরছে যেখানে দেখা যাচ্ছে তিনি বলছেন - এমপি হলে তিনি গাড়ি নিবেন না, তার কোন আত্মীয়ও নিবে না।
কিন্তু এখন আনুষ্ঠানিকভাবে গাড়ি চাইলেন। তার এই বক্তব্য অনেকের মনে প্রশ্ন তুলেছে-সংসদ সদস্যরা কি নিজেদের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেছেন? ইউএনও বা উপজেলা চেয়ারম্যানদের থাকার ব্যবস্থা আছে। এরপর কি এমপিরা সরকারি বাসভবনও চাইবেন? তাহলে একটা করে বাংলোর ব্যবস্থাও থাকবে তাহলে? সঙ্গে পিওন আর্দালি মালি দারোয়ান বাজার সর্দার বাবুর্চি ইত্যাদি?
বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থায় সংসদ সদস্যদের প্রধান ও মৌলিক কাজ হলো আইন প্রণয়ন এবং জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা। তারা জনগণের সমস্যার কথা সংসদে তুলে ধরবেন,নীতিনির্ধারণে অংশ নেবেন এবং রাজনৈতিকভাবে জনগণের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবেন। কিন্তু বাস্তবে একটি ভিন্ন চিত্র দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে। দেশে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে সংসদ সদস্যরাই তাদের নির্বাচনী এলাকার "প্রধান ব্যক্তি"। তারা উন্নয়ন কাজ তদারকি করবেন,বিচার-আচার করবেন,এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও প্রভাব রাখবেন। এরা যেন একেকজন উন্নয়ন ঠিকাদার।
এই বাস্তবতা থেকেই হয়তো প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংসদ সদস্যদের তুলনা আসছে। কিন্তু এটি একটি বিপজ্জনক প্রবণতা। কারণ প্রশাসন ও রাজনীতির মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন থাকা জরুরি। আমলাতন্ত্রের কাজ হলো রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে নিরপেক্ষভাবে রাষ্ট্রের পক্ষে জনগণের সেবা করা। অন্যদিকে জনপ্রতিনিধিদের কাজ হলো জনগণের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
যদি সংসদ সদস্যরা নিজেদের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সমপর্যায়ে বা তাদের বিকল্প হিসেবে ভাবতে শুরু করেন,তাহলে এই ভারসাম্য ভেঙে পড়বে। তখন না প্রশাসন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে, না রাজনীতি তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারবে। এর ফলে সুশাসনের পরিবর্তে এক ধরনের ক্ষমতার দ্বৈততা তৈরি হবে,যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সুবিধা গ্রহণের প্রশ্ন। বর্তমান সংসদের সরকারি ও বিরোধী দল উভয়েই একসময় ঘোষণা দিয়েছিল যে তারা শুল্কমুক্ত গাড়ি নেবে না। এটি ছিল একটি ইতিবাচক বার্তা। জনগণের সঙ্গে সংহতি এবং দায়িত্বশীলতার প্রতীক। কিন্তু বাস্তবতা হলো,এই সংক্রান্ত আইন এখনও বহাল রয়েছে এবং তা বাতিল করার বিষয়ে কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে কথার সঙ্গে কাজের একটি অসামঞ্জস্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
প্রশ্ন হলো-আমরা কি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগোচ্ছি যেখানে জনপ্রতিনিধিরা ধীরে ধীরে প্রশাসনিক সুবিধা ও প্রভাবকে নিজেদের অধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছেন? যদি তা হয়,তাহলে গণতন্ত্রের মূল চেতনাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
সংসদ সদস্যদের জন্য নির্বাচনী এলাকায় বসার জায়গা থাকা অস্বাভাবিক। কারণ স্ব স্ব নির্বাচনী এলাকায় তাদের ঘরবাড়ি আছেন। এখন আনুষ্ঠানিক কার্যালয় দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেটি যেন ধীরে ধীরে প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে মিশে না যায়,সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। এমপির রাজনৈতিক কার্যালয় যদি প্রশাসনিক কার্যালয়ের সমান্তরাল হয়ে যায় তাহলে বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে। আরেকটি বড় সমস্যা হতে উপজেলা চেয়ারম্যানদের সাথে রাজনৈতিক সংঘাতও সৃষ্টি হতে এমপি মহোদয়ের।
গাড়ি বা অন্যান্য সুবিধার দাবি তোলার আগে তাদের নিজেদের ভূমিকা ও দায়িত্ব সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। তাদের আসল কাজ আইন প্রণয়ন। সেই কাজে ব্যস্ত থাকবেন বলে রাজধানীতে এমপি হোস্টেলও করা হয়েছে। এখন এলাকায়ও তারা সরকারি সুবিধা চাচ্ছেন।
রাষ্ট্র পরিচালনায় ভারসাম্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের মধ্যে সেই ভারসাম্য নষ্ট হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষই। তাই এখনই সময় এই প্রশ্নগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবার-সংসদ সদস্যরা কি তাদের মূল ভূমিকায় ফিরে যাবেন,নাকি প্রশাসনিক ক্ষমতার দিকে আরও এগিয়ে যাবেন?
Comments