মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে চাপে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে এক কঠিন সময় পার করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে পশ্চিমা খুচরা বিক্রেতারা আগামী মৌসুমে পোশাকের অর্ডার প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উচ্চমূল্যের কারণে ভোক্তাদের চাহিদা কমে যাওয়া এবং দোকানে অবিক্রীত পণ্যের মজুদ বাড়তে থাকাও এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় কারণ।
এই পরিস্থিতি স্থানীয় প্রস্তুতকারকদের জন্য নতুন করে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তারা আগে থেকেই লোডশেডিং, জ্বালানি সংকট এবং পরিবহন ব্যয়ের বৃদ্ধির মতো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছিল। সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে কাঁচামাল আমদানি ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন খরচ আরও বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। সম্প্রতি শুল্ক সংক্রান্ত অস্থিরতা কাটিয়ে খাতটি কিছুটা স্থিতিশীল হচ্ছিল, কিন্তু নতুন এই সংকট আবারও পরিস্থিতিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এর ফলে ভবিষ্যতে অর্ডারের পরিমাণ আরও কমে যেতে পারে।
ইউরোপীয় ক্রেতারা জানিয়েছেন, বর্তমানে তাদের কাছে আগের মৌসুমের অনেক অবিক্রীত পণ্য মজুদ রয়েছে। একই সঙ্গে চলতি মৌসুমের পণ্যও ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছে। ফলে নতুন অর্ডার দেওয়ার গতি কমে গেছে।
অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়া ৩৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৫০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে, যা প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
কারখানাগুলোও উৎপাদনে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। অনেক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে তুলার দাম বেড়ে যাওয়ায় সুতা উৎপাদন খরচ ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
তবে এই বাড়তি খরচ ক্রেতাদের ওপর চাপানো যাচ্ছে না। বিশ্ববাজারে ভোক্তারা এখন উচ্চমূল্যে পোশাক কিনতে আগ্রহী নয়। ফলে বছরের শেষে তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় কম হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুদ্ধের কারণে ব্যবসার গতি ধীর হয়ে গেছে এবং পুনরুদ্ধার এখনও অনিশ্চিত। ইউরোপে জ্বালানির দাম বাড়ায় শীতবস্ত্রের চাহিদা কিছুটা বাড়তে পারে, তবে মজুদ বেশি থাকায় নতুন অর্ডার তেমন বাড়ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রে পোশাকের চাহিদাও কমেছে, অন্যদিকে বাংলাদেশে ডিজেল সংকট উৎপাদনকে ব্যাহত করছে। ফলে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে অনেক রপ্তানিকারককে ব্যয়বহুল বিমান পরিবহন ব্যবহার করতে হতে পারে।
সব মিলিয়ে, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস—এই সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত একটি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। ভবিষ্যতে অর্ডার কমে যাওয়ার আশঙ্কা আরও জোরালো হয়ে উঠছে।
Comments