বৈচিত্র্যের রঙে লেখা নতুন ভোর
ভিন্নতাকে মুছে ফেলতে চাওয়া মানে প্রকৃতির স্বাভাবিক স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানো। কারণ পৃথিবীর আসল সৌন্দর্য একরঙা নয়, বরং তা রঙিন, বহুবর্ণ, বহুস্বরের এক অপূর্ব সমাহার। মানুষের ভাষা ভিন্ন, বিশ্বাস ভিন্ন, চিন্তার ধরণ ভিন্ন-এই ভিন্নতার ভাঁজেই লুকিয়ে থাকে জীবনের গভীরতা, বিস্ময় আর সৃষ্টির অনন্ত সম্ভাবনা। সব যদি একরকম হতো, তবে জীবন হারাত তার ছন্দ, তার কবিতা, তার অনির্বচনীয় মাধুর্য।
বৈচিত্র্য আমাদের শেখায়-সহনশীলতা, শ্রদ্ধা আর সহাবস্থানের শিল্প। তাই ভিন্নতাকে নিঃশেষ নয়, বরং আলিঙ্গন করাই মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।
এই ভাবনারই এক উজ্জ্বল প্রতীক বাংলা নববর্ষ। নতুন সূর্যের মতো এক নতুন শুরু, নতুন আশার উন্মেষ। ঘরে ঘরে রঙের ছোঁয়া, উৎসবের উল্লাস, হাসির ঝলকানিতে ভরে ওঠে চারদিক। অথচ এই আনন্দের আড়ালেই কোথাও জমে থাকে বেদনার ছায়া, অন্ধকারের স্তব্ধতা। উৎসবের সার্বজনীনতা যেন কোথাও গিয়ে থেমে যায় বিভাজন আর অসহিষ্ণুতার কঠিন দেয়ালে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের মর্মান্তিক ঘটনাটি আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দেয় গভীরভাবে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে উন্মত্ত জনতার হাতে প্রাণ হারান পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীর। শেষ মুহূর্তেও তিনি চেয়েছিলেন নিজের কথা বলার সুযোগ। একটি মানবিক আবেদন, যা হারিয়ে যায় উন্মত্ততার কোলাহলে। এই মৃত্যু শুধু একজন মানুষের নয়; এটি আমাদের সমাজের সহনশীলতার মৃত্যু, মানবিকতার ক্ষয়।
ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে মতের বৈচিত্র্যের পরিসর। একমুখী চিন্তার আধিপত্যে ভিন্নমত হয়ে উঠছে অপরাধ। কেউ আলাদা কথা বললেই তাকে শত্রু, ধর্মদ্রোহী কিংবা দেশদ্রোহীর তকমা দেওয়া হচ্ছে। ফলে সমাজে জন্ম নিচ্ছে ভয়, অবিশ্বাস আর নীরবতা—যেখানে মানুষ নিজের সত্য উচ্চারণ করতেও দ্বিধাগ্রস্ত।
গণতন্ত্রের প্রাণ হলো মতের ভিন্নতা। কিন্তু সেই প্রাণশক্তিই আজ ক্ষীণ হয়ে আসছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি, ভিন্নতা মানেই বিভাজন নয়; বরং সেটিই সহাবস্থানের ভিত্তি।
মাত্র এক মাস আগেই আমরা উদযাপন করেছি স্বাধীনতার ৫৫ বছর। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শুধু একটি ভূখণ্ড দেয়নি, দিয়েছে আত্মপরিচয়, মর্যাদা আর মানবিকতার এক দীপ্ত আলোকবর্তিকা। সেই আলোর ভিত ছিল সাম্য, সহমর্মিতা আর সহাবস্থান। কিন্তু আজ প্রশ্ন জাগে-আমরা কি সেই আলোর পথে আছি, নাকি অজান্তেই অন্ধকারের দিকে হাঁটছি?
রাজনীতির মঞ্চেও বারবার উচ্চারিত হয় সম্প্রীতি ও শান্তির কথা, কিন্তু বাস্তবের মাটিতে তার প্রতিফলন অনেক সময়ই ক্ষীণ। আদর্শের চেয়ে ক্ষমতার হিসাব বড় হয়ে ওঠে, আর সংখ্যার জোরে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তে হারিয়ে যায় সংখ্যালঘুর কণ্ঠস্বর। ফলে বিভাজনের আগুন আরও দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে।
এই সময় আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে-কেমন বাংলাদেশ চাই আমরা? এমন এক দেশ, যেখানে ভিন্নমতকে দমন করা হবে, নাকি এমন এক দেশ, যেখানে ভিন্নতার মাঝেই গড়ে উঠবে সহাবস্থানের সেতু?
সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে শুধু আইন নয়, প্রয়োজন মননের পরিবর্তন। শিক্ষা, সংস্কৃতি আর পারিবারিক মূল্যবোধের আলোয় নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে-মানুষ হওয়াই সবচেয়ে বড় পরিচয়। ধর্ম, ভাষা, মত- এসব পার্থক্যের ঊর্ধ্বে রয়েছে এক অভিন্ন মানবতা।
বাংলা নববর্ষের এই প্রভাতে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক-
বৈচিত্র্যকে আমরা রক্ষা করব,সহনশীলতাকে করব শক্তিশালী, আর গড়ে তুলব এক মানবিক সমাজ।
কারণ একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন মাপা যায় না শুধু অর্থনীতির অঙ্কে; তা মাপা যায় মানুষের হৃদয়ে-পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা আর সহাবস্থানের গভীরতায়।
নতুন বছরের সূচনায় তাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা-বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য,
বিভেদের মাঝে সহমর্মিতা, আর সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের এক আলোকিত বাংলাদেশ।
শেষ করছি কবিতা দিয়ে –
ছাড়পত্রের মতো আনন্দ
উৎসব তো শুধু আলোর মালা নয়
আমার কাছে তা এক টুকরো ছাড়পত্র
বদ্ধ শ্বাসের ভেতর থেকে
একটু খোলা আকাশে নাম লেখানোর অনুমতি।
যেখানে উৎসবের কোলাহল চাপা পড়ে
বহুদিনের শঙ্কা
আলোর ঝলকে
চেখ নিজেকেই ফাঁকি দেয়
ভয়কে একটু আড়াল করার জন্য
কিন্তু এই দেশ,এই সময়
ধর্মের নামে ধারালো হয়ে ওঠা সন্ধ্যা
মসজিদের মাইক, মন্দিরের ঘণ্টা
সবই যেন কখনো কখনো
মানুষের কণ্ঠকে ছাপিয়ে যায়।
উৎসব আসে
তবু আসে না নিশ্চিন্ততা
কারণ বিশ্বাস এখন শুধু প্রার্থনা নয়
কখনো কখনো অস্ত্রও বটে।
আমি তাই উৎসবকে দেখি
একটি সাময়িক পাসপোর্ট হিসেবে
কিছুক্ষণের জন্য
মানুষ হয়ে থাকার সুযোগ।
যেখানে হাত মেলানো যায়
নাম না জেনে
ধর্ম না জেনে
শুধু স্পর্শের উষ্ণতা দিয়ে।
এই অস্থায়ী মুক্তি
আমাকে বাঁচিয়ে রাখে
যেন অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে
হঠাৎ পাওয়া এক ফালি আলো।
তবু ভয় থাকে
উৎসব শেষ হলে
আবার কি ফিরে আসবে সেই সংকীর্ণ দেয়াল?
তাই প্রতিটি আলোর নিচে দাঁড়িয়ে
আমি মনে মনে লিখে রাখি
একদিন উৎসব হবে
ছাড়পত্র নয়
হবে জীবনের আরেকটি নাম।
Comments