জ্বালানি সংকট, শিল্পে বিপর্যয়, নিত্যপণ্যে আগুন
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ২০২৬ ঘিরে বৈশ্বিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনে। জ্বালানি থেকে খাদ্যপণ্য, বিমান চলাচল থেকে শিল্প-সব খাতেই দেখা দিয়েছে ব্যয় বৃদ্ধি ও সরবরাহ বিঘ্ন।
ফেব্রুয়ারির শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পরপরই ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রথম ধাক্কা লাগে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় বিপাকে পড়েন প্রবাসী কর্মীরা। একই সময় জ্বালানি সরবরাহে টান পড়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়।
এক মাসের মধ্যে পরিস্থিতির প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনেও। রান্নাঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এমনকি পলিথিন উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে ছোটখাটো পরিবর্তনও চোখে পড়ছে। সম্প্রতি রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে বিস্কুট থেকে শুরু করে রেস্টুরেন্টের খাবারের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য মধ্যপ্রাচ্য জ্বালানি তেল, এলএনজি, সার ও পেট্রোকেমিক্যালের প্রধান উৎস। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এসব পণ্যের দাম বেড়েছে, কোথাও কোথাও সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে আমদানিনির্ভর এই অর্থনীতিতে চাপ বেড়েছে বহুগুণ।
রপ্তানিমুখী খাতগুলো প্রথম ধাক্কা খায়। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে একটি কন্টেইনার পাঠাতে আগে যেখানে খরচ ছিল প্রায় ১,৫০০ ডলার, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬,৫০০ ডলারে। এতে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও কৃষিপণ্যের রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিমান খাতেও চাপ স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক বাজারে জেট ফুয়েলের দাম লাফিয়ে বাড়ায় দেশীয় বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান ভাড়া প্রায় ১,০০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
শিল্প খাতগুলোর অবস্থাও সংকটাপন্ন। রং শিল্পের প্রায় ২৫ শতাংশ কাঁচামাল সরাসরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। বর্তমানে এসব কাঁচামালের দাম ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। একই সঙ্গে শিপমেন্ট খরচ ও সময়ও বেড়েছে।
স্টিল শিল্পে হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তার কারণে কন্টেইনার সংকট দেখা দিয়েছে। স্ক্র্যাপের দাম টনপ্রতি ৭০-৯০ ডলার বেড়েছে।
প্লাস্টিক শিল্প, যেখানে প্রায় ৩০ হাজার প্রতিষ্ঠান জড়িত, তীব্র চাপে রয়েছে। পিভিসি, পলিপ্রোপিলিনসহ কাঁচামালের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। অনেক কারখানা ইতোমধ্যে উৎপাদন কমিয়েছে, কিছু বন্ধও হয়ে গেছে।
এফএমসিজি খাতেইউনিলিভারের মতো বড় কোম্পানিগুলোও আমদানিনির্ভর কাঁচামালের কারণে চাপে পড়েছে।
সিমেন্ট শিল্পেও একই চিত্র। ক্লিঙ্কার, জিপসামসহ কাঁচামালের দাম ৩০-৪০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে বাজারে সিমেন্টের দাম প্রতি বস্তায় ২৫-৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
ওষুধ শিল্পেও সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হচ্ছে। অধিকাংশ কাঁচামাল পেট্রোকেমিক্যালভিত্তিক হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। প্যাকেজিংয়ের রেজিনের দাম প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে এবং শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।
Comments