নেপাল পেরেছে, পারবে কী বাংলাদেশ?
রাষ্ট্রব্যবস্থার গুণে-মানে তুলনা করতে গেলে নেপাল এবং বাংলাদেশ-দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার উদাহরণ সামনে আসে। ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সূচকে অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক রূপান্তরের কিছু দিক নেপালকে নতুনভাবে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দ্রুত সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে নেপালের কিছু উদ্যোগ তুলনামূলকভাবে ব্যতিক্রমী বলে মনে হয়েছে।
নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডু দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য পরিচিত। সরকার পতন, জোট ভাঙন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব-এসব সেখানে অস্বাভাবিক কিছু নয়। অন্যদিকে ঢাকা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল প্রশাসনিক কাঠামো ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এবার স্বৈরতন্ত্র হটানোর প্রায় কাছাকাছি দৃশ্যপটের মাঝেও রাষ্ট্র, সরকার ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় তারা বাংলাদেশের তুলনায় কারিশমার পরিচয় দিয়েছে।
নেপাল যেভাবে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে দ্রুত সংস্কারের পথে এগিয়েছে, তা অনেকের কাছেই "কারিশমা" হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি-এর নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর কারণ বোধ হয় এটা যে তিনি নোবেল জয়ী নন। দীর্ঘ সময় ক্ষমতা আকড়ে থাকার ইচ্ছা তার ছিল না। তিনি অসংবেদনশীল হয়ে মব সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেননি, ধংসযজ্ঞ নিয়ন্ত্রণে আসার চেষ্টা করেছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে বিদ্বেষ আর প্রতিহিংসার চর্চা করেননি।
তিনি রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তার নেতৃত্বে ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া একটি বড় দৃষ্টান্ত। এটি প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে দ্রুত ও কার্যকর রূপান্তর সম্ভব।
সুশীলা কার্কি বলেন নি যে, ছাত্ররা তার নিয়োগ কর্তা। আর পার্থক্য রচিত হয়েছে সেখানেই। নেপালে আন্দোলনের ফ্রন্টলাইনার ছাত্ররা এই কয়েক দিনের মধ্যেই পড়ার টেবিলে ফিরে গেছে। ক্ষমতার শরিক হয়নি। লুটপাট, চাঁদাবাজি, মব, খবরদারির শরিক হয়নি। বরং আন্দোলনের সময়কার সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার জন্য ক্ষমাও চেয়েছে। এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে, যেখানে আন্দোলন ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার নয়, বরং পরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে আন্দোলনকারীরাই ক্ষমতা কাঠামোর নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠল। এর প্রভাব পড়েছে পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থায়। এখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতা ধরে রাখার প্রবণতা বেশি দৃশ্যমান ছিল। এমনকি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ ইউনুস-এর মতো ব্যক্তিও রাজনৈতিক বক্তব্য,বিতর্ক, বিদ্বেষ আর প্রতিহিংসা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারেননি।
নেপালের নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছেন নির্বাচিত তরুণ প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ, যিনি '১০০ দফার রোডম্যাপ' ঘোষণা করেছেন। এই রোডম্যাপে রাষ্ট্র সংস্কারের বেশ কিছু সাহসী পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে দলীয় ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা এবং নির্দলীয় ছাত্র সংসদ গঠন। এই উদ্যোগ শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা কমিয়ে একটি সুস্থ শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সরকারি চাকরিজীবী ও শিক্ষকদের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে। এতে প্রশাসন ও শিক্ষা খাতে নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে এবং জনসেবা আরও কার্যকর হতে পারে। বাংলাদেশের পেশাজীবীদের রাজনীতি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকেই প্রায় ধংসের প্রান্তে নিয়ে গেছে।
একইভাবে, অতীত ও বর্তমান রাজনৈতিক নেতাদের সম্পদের হিসাব নেওয়ার জন্য 'অ্যাসেট ইনভেস্টিগেশন কমিটি' গঠন দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তা দেয়।
শিক্ষা খাতেও নেপাল কিছু নতুন ধারণা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রথাগত পরীক্ষা বাতিল করে শিশুদের সৃজনশীলতা ও মানসিক বিকাশে জোর দেওয়া হচ্ছে। এটি আধুনিক শিক্ষাদর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে চিন্তাশক্তি ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যয় সংকোচন এবং দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা কমানো এবং ব্যয়ের উপর নিয়মিত নজরদারির উদ্যোগও উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি একটি উন্মুক্ত ড্যাশবোর্ড চালু করা হয়েছে, যেখানে নাগরিকরা সরাসরি সরকারের প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি আধুনিক পদ্ধতি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নেপালের এই সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলো এখনো পরীক্ষাধীন। এগুলোর সফল বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে দেশটির ভবিষ্যৎ উন্নয়ন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট-রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নাগরিক সচেতনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার একত্রে কাজ করলে একটি দেশ দ্রুত ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে এগোতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এখান থেকে শিক্ষণীয় দিক হলো-শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটানো যায়, তাহলে টেকসই উন্নয়ন আরও দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।
Comments