জ্বালানি নির্ভরতার ফাঁদে বাংলাদেশ
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আবারও প্রমাণ করে দিল, জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কতটা নাজুক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। জিরকো কার্বন এনালিটিক্সের নতুন বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এই সংকটের কারণে দেশের বার্ষিক জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে অতিরিক্ত ৪.৮ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। এমন একটি ধাক্কা শুধু অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে না, বরং আমাদের দীর্ঘদিনের জ্বালানি নীতির দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে আসে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় করে। নতুন পরিস্থিতিতে এই ব্যয় আরও বাড়লে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আমদানি কভার অনুপাত ৫.৭ মাস থেকে কমে ৪.৯ মাসে নেমে আসতে পারে। এর অর্থ হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো অস্থিরতা দেখা দিলে তা মোকাবিলার সক্ষমতা আরও কমে যাবে। একই সঙ্গে টাকার মান কমে যাওয়া, মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি এবং ঋণের সুদের হার বাড়ার মতো ঝুঁকিও সামনে আসবে।
এই সংকট নতুন কিছু নয়। আমরা এর আগেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় এলএনজির দাম কয়েকগুণ বেড়ে গিয়ে দেশে বিদ্যুৎ সংকট তৈরি করেছিল। ২০২২ সালে ব্যাপক লোডশেডিংয়ে প্রায় ১৩ কোটি মানুষ বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে আমরা একই পথেই হাঁটছি আরও বেশি আমদানি নির্ভরতার দিকে।
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৪৬ শতাংশই আমদানিনির্ভর। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা আরও বেশি, প্রায় ৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য অস্থিরতাও দেশের ভেতরে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতের ফলে হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় সেই আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
এলএনজি সরবরাহে কাতারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কাতার থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে ২৩ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্পখাতেও এর প্রভাব স্পষ্ট। সার কারখানা বন্ধ থাকছে, পোশাক শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা দেখা যাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশ এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিবর্তে নতুন করে এলএনজি-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ৪১টি নতুন এলএনজি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়াবে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি, যা দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা-দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর। ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতি বছর ৭৬০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যুক্ত করার প্রয়োজন হলেও বাস্তবে সেই গতি অনেক কম। বর্তমানে দেশের জ্বালানি মিশ্রণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ২ শতাংশের আশেপাশে স্থির হয়ে আছে। এটি শুধু নীতিগত ব্যর্থতাই নয়, বরং একটি বড় সুযোগ হারানোরও উদাহরণ।
এই সংকটের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সম্ভাবনা। যদি সরকার এখনই সঠিক নীতি গ্রহণ করে, তবে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশের জ্বালানি খাতকে আরও স্থিতিশীল করা সম্ভব। সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে শুল্ক কমানো, ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা, এবং বেসরকারি বিনিয়োগ সহজ করার এখনই সময়। এসব পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র ১ মেগাওয়াটের একটি ছাদভিত্তিক সৌর প্রকল্প প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ডলার সমমূল্যের জ্বালানি আমদানি সাশ্রয় করতে পারে। এটি শুধু অর্থনৈতিক সাশ্রয়ই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি কার্যকর উপায়।
সবশেষে বলা যায়, বর্তমান সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আমাদের দীর্ঘদিনের নীতিগত ভুলের ফল। বারবার একই ধরনের ধাক্কা খাওয়ার পরও যদি আমরা দিক পরিবর্তন না করি, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের মুখোমুখি হতে হবে। এখন সময় এসেছে বাস্তবতা স্বীকার করে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার, জীবাশ্ম জ্বালানির ফাঁদ থেকে বেরিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাওয়ার।
বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু একটি সংকট নয়, বরং একটি মোড় ঘোরানোর সুযোগ। এই সুযোগ আমরা কাজে লাগাতে পারব কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
Comments