ভূগোলের একটা জেদ আছে-প্রতিবেশী বদলানো যায় না
রাজনীতির মঞ্চে স্লোগান খুব শক্তিশালী জিনিস। স্লোগান মানুষের আবেগকে জাগায়, জনতাকে একত্র করে, আর মুহূর্তের মধ্যে একটি জটিল বাস্তবতাকে সহজ একটি বাক্যে রূপ দেয়। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব জগতে স্লোগানের শক্তি প্রায়ই ভূগোল ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কঠিন নিয়মের সামনে থেমে যায়। সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা সে কথাই বলে। ভারত থেকে পাইপলাইনে ডিজেল আসা এবং রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছাড় চাওয়া, এই বাস্তবতারই এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যখন বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার অস্থির, তখন বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে। ঠিক এই সময় পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল। শুধু তাই নয়, আরও চার মাসে অতিরিক্ত ৫০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আনার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর কাছে।
মজার বিষয় হলো-দেশে ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর যে রাজনীতির ঢেউ উঠল, তার বড়ো স্লোগান ছিল "ভারত বিরোধিতা"। মুখে মুখে প্রশ্ন-"ঢাকা না দিল্লি?" আর উত্তরে সমস্বরে "ঢাকা, ঢাকা।"
কিন্তু বাস্তবতার রাজনীতি অনেক সময় স্লোগানের রাজনীতিকে চুপ করিয়ে দেয়। প্রয়োজনের সময় সেই ভারত থেকেই আসে ডিজেল, তার আগেও এসেছে চাল, পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্য। তখন আবার ব্যাখ্যা "গোলামি না, টাকা দিয়ে কিনেছি।"
ঠিকই তো, টাকা দিয়েই কিনেছি। কিন্তু তখন একটা সরল প্রশ্ন মাথায় আসে -যদি শুধু টাকার বিষয়ই হতো, তাহলে পাকিস্তান বা চীন থেকে কেন আনা হলো না?
আসলে সত্যটা খুব কঠিন নয়। ভূগোলের একটা জেদ আছে-প্রতিবেশী বদলানো যায় না। তাই রাজনীতির মঞ্চে যতই গলা ফাটুক, বাস্তবের দরজায় কড়া নাড়ে সেই প্রতিবেশীই।
স্লোগান বদলায়, পোস্টার বদলায়, সরকার বদলায়-কিন্তু মানচিত্রটা বদলায় না।
এবার আরেক প্রসঙ্গ। বাংলাদেশ নাকি স্বাধীন দেশ? অন্তত আমরা তাই বলি, মঞ্চে, মাইকে, মিছিলে। মাঝেমধ্যেই শোনা যায়,"এই দেশ কারও গোলাম নয়।" কিন্তু বাস্তবতার মঞ্চে দাঁড়ালে দৃশ্যটা কেমন যেন ভিন্ন লাগে।
সম্প্রতি সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করেছে-ভারতের মতো বাংলাদেশকেও যেন রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে অস্থায়ী ছাড় দেওয়া হয়। যুক্তি দেওয়া হয়েছে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং জাতীয় অর্থনীতিকে সহায়তা করার প্রয়োজনীয়তার কথা। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় এই বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে।
প্রশ্নটা এখানেই। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র যদি অন্য একটি দেশের অনুমতি চেয়ে বলে, "আমাদেরও একটু ছাড় দিন, আমরা তেল কিনতে চাই", তাহলে সেই সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা কোথায় দাঁড়ায়?
এটাই সত্য যে, বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতা কঠিন। বড়ো শক্তির নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ, কূটনৈতিক ভারসাম্য-এসবের হিসাব করেই ছোট ও মধ্যম দেশগুলোকে চলতে হয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, কথায় কথায় "আজাদি" "আজাদি" স্লোগানের গৌরবগাঁথা শুনতে শুনতে যখন দেখা যায় গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তেও অন্য কারও 'সবুজ সংকেত' দরকার, তখন স্বাধীনতার ভাষণগুলো কিছুটা ফাঁপা মনে হয়।
আরেকটি বিষয়ও চোখে পড়ে। ভারত রাশিয়ার তেল কিনছে-খোলাখুলিভাবে, নিজের স্বার্থে। তাদের কেউ অনুমতি চাইতে দেখেনি। তারা কূটনীতি করে, দর কষাকষি করে, কিন্তু আত্মসম্মানটুকু অন্তত প্রকাশ্যে বন্ধক রাখে না।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেন উল্টো ছবি-মুখে আজাদির জোরালো স্লোগান, আর বাস্তবে অনুমতির অপেক্ষা।
তাই প্রশ্নটা রয়ে যায়-আমরা কি সত্যিই স্বাধীন সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছি, নাকি স্বাধীনতার স্লোগানটা শুধু মঞ্চের জন্য,আর বাস্তব নীতিতে চলছে অনুমতির রাজনীতি?
সুতরাং এটাই বলা যায়, রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা আবেগের রাজনীতি থেকে অনেক আলাদা। স্লোগান মানুষের মন জাগায়, কিন্তু জ্বালানি, খাদ্য বা অর্থনীতির মতো মৌলিক প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয় হিসাব কষে, বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে। ভূগোল, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য-এই তিনটির সীমা মেনেই ছোট ও মধ্যম দেশগুলোকে পথ চলতে হয়।
তাই স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ হয়ত কেবল উচ্চস্বরে ঘোষণা করা নয়; বরং সীমাবদ্ধ বাস্তবতার মধ্যেও নিজের স্বার্থকে সবচেয়ে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে রক্ষা করা। প্রতিবেশী বদলানো যায় না, বৈশ্বিক শক্তির রাজনীতিও একদিনে বদলায় না। কিন্তু সেই বাস্তবতার মধ্যেই যদি একটি রাষ্ট্র নিজের মর্যাদা, স্বার্থ ও ভারসাম্য রক্ষা করে এগোতে পারে, সেটাই প্রকৃত স্বাধীনতার সবচেয়ে বাস্তব ও টেকসই রূপ।
Comments