খামেনি যুগের ছায়া পেরিয়ে ইরানের নতুন ভোর
আমেরিকা এবং ইসরায়েল যে এবার ইরানের নেতৃত্ব-কে হত্যা করতেই হামলা করেছে তা ট্রাম্পের কথাতেই স্পষ্ট ছিল। রেজিম চেঞ্জ বা সরকার পরিবর্তনই যে এজেন্ডা সেটা পরিষ্কার করেই বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানি জনগণ-কে ক্ষমতা নেওয়ার জন্য তার আহবানের মধ্যেই জানা গেলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি মারা গেছেন। নিজের অফিসে বসেই কাজ করছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনি। আচমকা সেখানেই বোমা এসে পড়ে। তাঁর সঙ্গে মৃত্যু হয় তাঁর কন্যা, জামাতা এবং নাতনিরও।
মার্কন প্রেসিডেন্ট ডেনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, এখন ইরানের সাথে কথা বলতে সুবিধা হবে। এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কূটনীতি সহজ পথে চলবে। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যে প্রশ্ন বর্তমানে ঘুরছে তা হলো: সর্বোচ্চ নেতা না থাকলে কি ইসলামী প্রজাতন্ত্রও টিকবে?
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল যাতে কোনো এক ব্যক্তির উপর রাষ্ট্র নির্ভরশীল না থাকে। অনেকে সেটাই বলছেন। এবং সে জন্যই দেখা গেল ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড বাহিনী বলছে,খামেনির মৃত্যুতে তারা শোকাহত। তবে প্রত্যাঘাত হবে। আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের বাহিনীকে নিশানা করে 'ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্র হামলা'র হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
এটাই প্রথমবার নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের কমান্ড কাঠামো ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলি সাইবার অভিযানে ভুয়া জরুরি সংকেত পাঠিয়ে ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বকে একটি বাঙ্কারে জড়ো করা হয় এবং একযোগে হামলা চালানো হয়। নিহত হন আইআরজিসি কমান্ডার,সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ও দুই প্রধান যুদ্ধ কমান্ডের প্রধানরা।
তবু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কাঠামো নতুন নেতৃত্ব বসায়। ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া বন্ধ হয়নি। রাষ্ট্র ভেঙে পড়েনি।
সোভিয়েত যুগে একটি অস্ত্রব্যবস্থা ছিল পেরিমিটার সিস্টেম যা পশ্চিমা বিশ্লেষকদের কাছে পরিচিত 'ডেড হ্যান্ড' নামে। এর কাজ ছিল,যদি নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়,তবু স্বয়ংক্রিয়ভাবে পারমাণবিক প্রতিশোধ নেওয়া। ধারণাটি ছিল-নেতৃত্ব ধ্বংস করলেও প্রতিশোধ আটকানো যাবে না।
ইরানও অনুরূপ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে যন্ত্রে নয়, প্রোটোকলে। আন্তর্জাকিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সম্ভাব্য 'ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক' মাথায় রেখে আগেই নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অনুমতি দিয়ে রাখা হয়েছিল। ফলে এখন উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি,তেলআবিব ও দুবাই লক্ষ্য করে যে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হচ্ছে,তা সর্বোচ্চ নেতার সরাসরি নির্দেশ ছাড়াই হচ্ছে। মাথা নেই-কিন্তু দেহ চলছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বে প্রতিদিনের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। বড় বড় তেল-গ্যাস কোম্পানি ইতিমধ্যেই শিপমেন্ট স্থগিত করেছে। যদি নেতৃত্বহীন ইরানি সামরিক কাঠামো পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য শেষ করে ফেলে,এরপর কী করবে-এ প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
উত্তরাধিকার নয়, নিয়ন্ত্রণই বড় প্রশ্ন
১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লা খোমেনি যে নীতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা ছিল-রাষ্ট্র ব্যক্তির চেয়ে বড়। ১৯৮৯ সালে তাঁর মৃত্যুর পর আলি খামেনি দ্রুতই দায়িত্ব নেন, যদিও তখন তাঁর ধর্মীয় যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এতে প্রমাণ হয়, সংকটেও কাঠামো কাজ করতে পারে।
কিন্তু সক্ষমতা আর স্থিতিস্থাপকতা এক জিনিস নয়। গত নয় মাসে নেতৃত্বের দুটি পূর্ণ স্তর হারিয়েছে এই প্রতিষ্ঠান। এখন নতুন শূন্যতা তৈরি হয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা বাছাইয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিষদও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ফলে প্রশ্ন হলো কে সিদ্ধান্ত নেবে,কখন যুদ্ধ থামবে?
চারটি সম্ভাব্য পথ
১. ইরানের বিপ্লবী বাহিনী আইআরজিসি নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারে। নিরাপত্তা বাহিনী সমষ্টিগত নেতৃত্ব গঠন করে,পাশে একজন ধর্মীয় প্রতীকী নেতা বসাতে পারে। ।
২. দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতার দ্বন্দ্ব -সামরিক,ধর্মীয় ও প্রাদেশিক কমান্ডের মধ্যে টানাপোড়েন;জ্বালানি বাজারে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা।
৩. জনঅভ্যুত্থান - জানুয়ারি ২০২৬-এর ঘটনার নজির ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জন্য ট্রাম্পের ঘোষিত দায়মুক্তির প্রস্তাব পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। তবে সংগঠিত বিকল্প নেতৃত্বের অভাব বড় বাধা।
৪. রাষ্ট্রীয় পতন - প্রতিবেশী দেশগুলো যেটির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
প্রায় সব দৃশ্যপটেই একটি বিষয় স্পষ্ট - অন্তত ৬০-৯০ দিন লাগতে পারে নতুন শক্তিকেন্দ্র গড়ে উঠতে এবং সামরিক ইউনিটগুলোর উত্তেজনা কমাতে ।
কে উত্তরসূরি?
সবাই জানতে চাইছে-খামেনির জায়গায় কে আসবেন। কিন্তু আরও জরুরি প্রশ্ন হলো-আগে থেকে অনুমোদিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কে বন্ধ করবে?
ইরান ঘোষণা দিয়েছে যে খামেনির মৃত্যুর পর অন্তর্বর্তী সময়ে দেশ পরিচালনার তত্ত্বাবধান করবেন প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন ধর্মীয় নেতা। বিবিসির আরেক খবরে বলা হয়,এখন অ্যাসেম্বলি অব লিডারশিপ এক্সপার্টস খামেনির উত্তরসূরি নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করবে।
নতুন সর্বোচ্চ নেতা বসতে সময় লাগবে। কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্রের সিদ্ধান্ত ঘণ্টায় ঘণ্টায় নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যেই উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটি,হরমুজ প্রণালী,এমনকি দুবাইয়ের মতো শহরগুলো নিজেদের সংকট সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়তে পারে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র গড়ে উঠেছিল নেতাদের টিকে থাকার বাইরে টিকে থাকতে।
কিন্তু নেতৃত্বহীন অবস্থায় কখন থামতে হবে-সেই প্রশ্নের উত্তর কি তার কাছে আছে?
খামেনি যুগের ছায়া পেরিয়ে ইরানের নতুন ভোর
আলী খামেনির নেতৃত্বাধীন সময়কালে চরম কট্টরবাদী শাসন ব্যবস্থা দেখেছে। কঠোর ধর্মভিত্তিক শাসন,রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের পর্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয় তার শাসন কালকে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তে সুপ্রিম লিডারের প্রভাব,নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধতা,মতপ্রকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং সাংস্কৃতিক বিধিনিষেধ,বিশেষ করে নারীর পোশাকবিধি,ভিন্নমত দমনের অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাজনিত অর্থনৈতিক চাপ সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে বড় আকারে।
ইরানের মানুষ আশা করছে এক নতুন ভোরের। ইরানের তরুণ প্রজন্ম,যারা বৈশ্বিক সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির সঙ্গে সংযুক্ত, তারা অধিক সামাজিক স্বাধীনতা, স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ প্রত্যাশা করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন ও জনমতের আলোচনায় এই চাহিদা আরও স্পষ্ট হয়েছে। ইরানে অতীতের রক্ষণশীল কাঠামো ও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য উদারতার মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। এটি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘোষণা না দিলেও ইঙ্গিত করে - ইরানের ভেতরে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জোরালো,এবং সেই আকাঙ্ক্ষাই হয়তো খামেনির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নতুন ভোরের সূচনা করবে।
Comments