সাংস্কৃতিক ঐক্যের জন্য ভাষাগত বৈচিত্র্য অপরিহার্য
যুক্তরাজ্যে পার্লামেন্টের সদস্য এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা বিশ্বব্যাপী ভাষাগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রসারে জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তারা বলেন, বহুভাষিকতা সাংস্কৃতিক পরিচয় ও বৈশ্বিক পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তি।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ হাই কমিশন, লন্ডন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তারা এ মন্তব্য করেন। গত বুধবার যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্সের একটি কমিটি কক্ষে এ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশন এ তথ্য জানায়।
অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ এমপি ও কূটনীতিকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত এমপিদের মধ্যে ছিলেন রুপা হক, রুশনারা আলী, শওকত অ্যাডাম, মোহাম্মদ ইয়াসিন ও ইমরান হুসেইন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন লর্ড রামি রেঞ্জার।
কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত উত্তর মেসিডোনিয়ার রাষ্ট্রদূত ক্যাটেরিনা স্তাভরেস্কা; কোস্টা রিকার রাষ্ট্রদূত রাফায়েল অর্তিজ ফাব্রেগা; ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত দেশরা পারচায়া এবং ঘানার হাই কমিশনার সাবাহ জিতা বেনসন।
যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও) এবং ন্যাশনাল কমিশন ফর ইউনেস্কোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জন লেননের 'ইম্যাজিন' গানের স্যাক্সোফোন পরিবেশনা করেন ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত দেশরা পারচায়া ও তার সহকর্মী মার্লন গ্যাব্রিয়েল। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ব্যারোনেস মঞ্জিলা উদ্দিন।
যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার আবিদা ইসলাম তার বক্তব্যে আন্তর্জাতিক 'মাতৃভাষা দিবস হিসেবে' ২১ ফেব্রুয়ারিকে বিশ্বস্বীকৃতি প্রদানে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ভাষাগত অধিকার ও সাংস্কৃতি সংরক্ষণের গুরুত্বকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার ভিত্তি তৈরি করেছে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউসিএল ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টারকালচারাল স্টাডিজের পরিচালক অধ্যাপক ঝু হুয়া। তিনি বলেন, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর অধিকার রয়েছে এমন ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের, যা তারা বোঝে। 'মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা আমাদের যৌথ ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য। এর মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও বহুভাষার মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি হয়। বহুভাষিকতা শুধু 'আমি' হওয়া নয় বরং 'আমরা'কে কল্পনা করা'।
ক্যাটেরিনা স্তাভরেস্কা বলেন, উত্তর মেসিডোনিয়ার আধুনিক রাষ্ট্র সহনশীলতা ও অংশীদারিত্বমূলক নাগরিকত্বের আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের দেশে একাধিক ভাষা সহাবস্থান করছে।
তিনি উল্লেখ করেন, মেসিডোনীয় ভাষার পাশাপাশি আলবেনীয়, তুর্কি, সার্বীয়, বসনীয়, ভ্লাখ ও রোমানি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী সেখানে বসবাস করে। 'মাতৃভাষাভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি অন্তর্ভুক্তি, সমান সুযোগ এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য'।
রাফায়েল অর্তিজ ফাব্রেগা বলেন, মাতৃভাষা কেবল একটি একাডেমিক ধারণা নয়, এটি আমাদের পরিচয়ের প্রতিফলন।
তিনি বলেন, কোস্টারিকা একটি বহুভাষিক দেশ, যেখানে বৈচিত্র্য সংরক্ষণ—বিশেষত আদিবাসী ভাষার সুরক্ষা—জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত। 'বহুভাষিক শিক্ষা সাংস্কৃতিক পরিচয়কে শক্তিশালী করে, শিক্ষার ফলাফল উন্নত করে এবং সামাজিক সংহতি বৃদ্ধি করে'।
দেশরা পারচায়া ইন্দোনেশিয়ার ভাষাগত সমৃদ্ধির কথা তুলে ধরে বলেন, দেশটিতে ৭০০-রও বেশি জাতিগত ও স্থানীয় ভাষা প্রচলিত। 'বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য-বৈচিত্র্য আমাদের সম্পদ। সবকিছু একই রকম নয়।
সাবাহ জিতা বেনসন বলেন, ঘানায় প্রায় ৮০টি আদিবাসী ভাষা প্রচলিত। তিনি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারির স্বীকৃতি অর্জনে বাংলাদেশের উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, বহুভাষিকতা ও বহুসংস্কৃতিবাদ ঐক্যের পরিপন্থী নয়; বরং এটি শক্তির উৎস। আসুন নিশ্চিত করি-কোনো ভাষা ও কোনো জনগোষ্ঠী যেন পিছিয়ে না থাকে।
লর্ড রামি রেঞ্জার বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনায় ভাষা আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে বৈচিত্র্যকে সম্মান করা হয় এবং আইন দ্বারা সুরক্ষিত। যেসব দেশ পদ্ধতিগতভাবে মানুষকে বৈষম্যের শিকার করে, তারা এগিয়ে যেতে পারে না।
Comments