বামেরা কী এবার তাদের রাজনীতি বদলাবেন?
বাংলাদেশের এবারের ত্রয়োদশ নির্বাচনের ফলাফলের পর এখন অনেকের মনেই প্রশ্ন- দেশের বাম রাজনীতির এই হাল কেন? বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ আসন পেয়েছে। ধর্মভিত্তিক দল জামায়াত বিশাল দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তরুণদের নতুন দল এসসিপিও ছয়টি আসন পেয়েছে। কিন্তু কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বামদের, যারা কিনা সবসময় দাবি করে তারাই প্রকৃত অর্থে জনস্বার্থে রাজনীতি করে।
এই নির্বাচনে বামপন্থিরা এক কৌতুকজনক ফলাফল জাতিকে উপহার দিয়েছে। বামপন্থিদের গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট সব আসনে প্রার্থীই দিতে পারেনি। ১৪৭ জন প্রার্থীর সম্মিলিত ভোট প্রাপ্তির পরিমাণ ১ লাখ ২৪ হাজার ৬৮৭, যা প্রদত্ত মোট ভোটের মাত্র ০.১৭ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়ো বাম দল সিপিবি ৬৩ আসনে ভোট পেয়েছে মাত্র ০.০৮ শতাংশ, বাসদ ৩৬ আসনে ০.০৫ শতাংশ। বাকিদের কথা আর নাইবা উল্লেখ করা হলো। প্রার্থীদের মধ্যে বাসদের ডাক্তার মণিষা চক্রবর্তী কিছুটা আলোচনায় ছিলেন এবং বরিশালের একটি আসনে ভোট পেয়েছেন ২২ হাজারের কিছু বেশী। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। সেই ভোটগুলোরও ছিটেফোঁটা তারা পায়নি।
বোঝাই যাচ্ছে, দেশে বামপন্থিদের নিদারুণ অবস্থা। বামপন্থা যেন একেবারে শেষ পর্যায়ে। দলগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, কেমন ভগ্নক্লান্ত অবস্থা। বামপন্থী দলগুলো যেন এনজিওতে পরিণত হয়েছে। ভাল ভাল কথা বলবে, জনকল্যাণের বুলি আউড়াবে, কিন্তু গণসংগঠন গড়ে তুলবে না। বামেরা মৌলবাদ ঠেকাতে চায়, কিন্তু গণ সংগঠন ছাড়া দক্ষিণপন্থা ও মৌলবাদকে প্রতিরোধ করা যাবে না, সেই বুঝটাও নেই।
বাংলাদেশে বামপন্থার এই করুণ অবস্থার জন্য তারা নিজেরাই দায়ী। জনগণের কাছে, এমনকি নাগরিক তরুণদের কাছেও এই বাম নেতা ও বুদ্ধিজীবীরা বিশ্বাসযোগ্য নয়। সারাজীবন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ স্লোগান দেয়া, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এর তুমুল সমালোচনা করা বাম বুদ্ধিজীবীরা দিনশেষে আমেরিকাতেই যায়, সন্তানদেরও সেখানেই পাঠায় এবং কাজও করেন বিশ্বব্যাংক আইএমএফ-এ। এরকম দৃষ্টান্ত অসংখ্য।
স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রায় সব সরকারের সঙ্গেই বাম ও কমিউনিস্টদের ক্ষমতা ভাগাভাগি বা অংশীদারিত্ব লক্ষ্য করা গেছে। বুর্জোয়াদের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগিকালে ইস্যু হিসেবে মৌলবাদ এবং বিকল্প শক্তি অর্জন ও বিপ্লবের কথা বলা হলেও বাস্তবে এ তত্ত্বের আড়ালে অসংখ্য বাম নেতাকর্মী ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে বিলীন হয়েছেন। অর্থাৎ নিজেদের আলাদা কোন সত্তা জানান দিতে পারেননি তারা। অনেক বাম নেতাকর্মী এ প্রক্রিয়ায় সুবিধাবাদী জীবন যাপন করে প্রচুর অবৈধ ধনসম্পদ অর্জন করেছেন। অনেকে অসংসদীয় বা অগণতান্ত্রিক পথে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হয়েছেন এবং গণবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। বাম ও কমিউনিস্টদের চরম সুবিধাবাদী জীবনযাপন নিপীড়িত জনগণ ভালো চোখে দেখছে না। বামপন্থিদের ওপর জনগণের চরম হতাশা ও আস্থাহীনতা বেড়েছে।
এসব কথা উঠলেই বামপন্থী নেতারা বলেন -'আমাদের কিছু কিছু কৌশলগত অ্যালায়ান্স করতে হবে, দেখতে হবে কার সঙ্গে জোটা যায়' ইত্যাদি। প্রতিবার ভরাডুবির পর বলেন 'আমাদের কিছু ভুল হয়েছিল'। কিন্তু জনসাধারণ আর কোনোদিন জানতে পারেনা, ভুলটা ঠিক কী ছিল।
আমাদের সংঘাতময় রাজনীতির নানা ঐতিহাসিক উপাদানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিছু নতুন উপাদান : নারীসমাজের উপর গুরুত্ব, নির্দিষ্ট প্রশাসনিক পদ্ধতির উদ্ভাবন, সাধারণ কল্যাণ ও নিরাপত্তার সঙ্গে বিশেষ বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়সমূহের জন্য বিশেষ জনকল্যাণ নীতি। এসব জায়গায় দেশের সাবেক বামপন্থিরা উদাসীন ছিলেন। আশির দশকের কিছু সীমিত সংস্কারে তাঁরা আটকে থাকেন, শেষ হয়ে যায় জনসমাবেশের বৈচিত্র, স্থবিরতা আসে কর্মচাঞ্চল্যে। জনবাদী রাজনীতির তাৎপর্য উপলব্ধিতে অক্ষম হওয়ায় তাঁরা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারলেন না। সমাজের বদ্ধদশা কাটাতে যে পথ নিলেন, তা আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়াল। এ যুগের তরুণ বামেরা এসবের জন্য নামে আসছে বারবার, কিন্তু তাদের কোন সংগঠন নেই।
বাংলাদেশে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর জনবিচ্ছিন্নতার পেছনে বিভিন্ন ঐতিহাসিক, সাংগঠনিক ও কৌশলগত কারণ রয়েছে। নিচে পয়েন্ট আকারে তুলে ধরা হলো :
অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও দলাদলি
একাধিক বাম দল ও উপদলের সৃষ্টি। ফলে সংগঠনের শক্তি খণ্ডিত হয়েছে। নেতাদের মন খারাপ হলেই দল ছেড়ে নতুন দল করেন।
আদর্শিক কঠোরতা ও বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যতা
অনেক ক্ষেত্রে মার্কসবাদী তত্ত্বের কড়াকড়ি প্রয়োগ, কিন্তু সমসাময়িক সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে সমন্বয় করতে ব্যর্থতা।
গণভিত্তি দুর্বল হওয়া
শ্রমিক-কৃষকভিত্তিক রাজনীতি দুর্বল হয়ে পড়া; শিল্পায়ন ও কৃষি কাঠামোর পরিবর্তনের সাথে সংগঠনগত অভিযোজনের ঘাটতি।
বড়ো দলগুলোর প্রভাব
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর মতো বড়ো দলগুলোর প্রভাব ও দ্বিমেরু রাজনীতির কারণে বাম দলগুলো কোণঠাসা।
নির্বাচনি ব্যর্থতা ও কৌশলগত দুর্বলতা
জোট রাজনীতিতে অস্পষ্ট অবস্থান, কখনও বড়ো দলের সঙ্গে আপোশ। ফলে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ
আধুনিক যোগাযোগমাধ্যম ও নতুন রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহারে পিছিয়ে থাকা।
রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও প্রতিকূল পরিবেশ
বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দমন, মামলা-হামলা, সংগঠন পরিচালনায় বাধা।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের প্রভাব
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও বৈশ্বিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের দুর্বলতা বাম রাজনীতির মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত সংকট তৈরি করেছে।
ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনে সীমাবদ্ধতা
শ্রমিক অধিকার, শিক্ষা বা পরিবেশ ইস্যুতে সক্রিয় থাকলেও তা বৃহত্তর রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে না পারা।
মধ্যবিত্তের সঙ্গে দূরত্ব
শহুরে মধ্যবিত্ত ও নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণির কাছে বাম রাজনীতির বার্তা কম গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠা।
প্রশ্ন হলো, বামপন্থা কি শেষ হয়ে গেল? হয়ত না। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে রক্ষা, পিছিয়ে পড়াদের সামাজিক সুরক্ষা, জনকল্যাণ নীতি, জনমুখী প্রশাসন পদ্ধতি, সর্বোপরি নারী ও কন্যাদের উপর বিশেষ গুরুত্ব ও গ্রামাঞ্চলে সরকারি ব্যয়বৃদ্ধি - এ সবের পিছনে দীর্ঘকালীন বামপন্থী চিন্তার প্রভাব আছে। বাংলার বামপন্থী ঐতিহ্য থেকে জনগণ অনেক কিছু শিখেছে। বামপন্থাকে টিকে থাকতে হবে নানা নতুন পন্থায়। সংঘর্ষের জন্য যে আত্মশক্তি ও আত্মভরসা চাই, তারও অন্যতম উৎস গণসংঘর্ষের রাজনীতির ইতিহাস।
বামপন্থী ভাবনার ইতিহাস। কিন্তু দক্ষিণপন্থি কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে বামপন্থী আন্দোলনের অস্তিত্ব আজ বাংলাদেশে কোথায়?
Comments