দ্রুত বদলে যাওয়া বিশ্বব্যবস্থা: মার্ক কার্নির বক্তব্য
জেফরি আল কাদরি
আন্দ্রে জিকের একটি ভিডিওতে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার দ্রুত পরিবর্তন নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ—এবং অনেক ক্ষেত্রেই চমকপ্রদ—আলোচনা শুনলাম। সেখানে বারবার উঠে এসেছে কয়েকটি কেন্দ্রীয় ধারণা: গ্লোবালাইজেশনের অবসান, পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এ ব্যবস্থার ব্যর্থতা, পেট্রো-ডলার কাঠামোর ক্ষয়, এবং নতুন এক বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া। আরও তাৎপর্যপূর্ণ যে, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতো প্ল্যাটফর্মে (দাভোস) ক্ষমতাধর মহলও এখন আগের "পরিচিত" বিশ্ববন্দোবস্তের ভাঙন স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক—জানুয়ারি ২০২৬—মার্ক কার্নির বক্তব্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে দেওয়া একটি স্পেশাল অ্যাড্রেসে তিনি পুরোনো বিশ্ব ব্যবস্থার "rupture" (বিচ্ছিন্নতা/ভাঙন) এবং গ্লোবালাইজেশনের অবসানের কথাই সরাসরি বলেছেন। কার্নি—যিনি কানাডার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সেখানে বক্তব্য দিয়েছেন—মূলত কয়েকটি সুস্পষ্ট থিসিস দাঁড় করান, যা বর্তমান পরিবর্তনের চরিত্র বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, তিনি বলেন পুরোনো "rules-based international order" (নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা) আর আগের মতো ফিরে আসবে না। তাঁর ভাষায় এটি ছিল এক ধরনের "pleasant fiction" (সুন্দর মিথ্যা), যা দীর্ঘদিন টিকে ছিল মূলত American hegemony (আমেরিকান আধিপত্য)-এর জোরে। দ্বিতীয়ত, কার্নির মতে আমরা এখন কোনো স্বাভাবিক transition (ধীর পরিবর্তন)-এর মধ্যে নেই; বরং একটি প্রকৃত rupture-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বড় শক্তিগুলো (great powers) অর্থনৈতিক ইন্টিগ্রেশনকে ক্রমশ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে—ট্যারিফ, ফাইন্যান্সিয়াল ইনফ্রাস্ট্রাকচার, এবং সাপ্লাই চেইনের নির্ভরতাকে দুর্বলতা বানিয়ে চাপ সৃষ্টি করছে।
তৃতীয়ত, তিনি মনে করেন middle powers—যেমন কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ইত্যাদি—এখন আলাদা আলাদা অবস্থানে দুর্বল; তাই তাদের একত্রিত হয়ে কাজ করতে হবে। কারণ, "if we're not at the table, we're on the menu"—অর্থাৎ সিদ্ধান্তের টেবিলে না থাকলে, সিদ্ধান্তের শিকার হতে হবে। চতুর্থত, কার্নির বিশ্লেষণে পুরোনো ব্যবস্থায় আমেরিকান হেজেমনি কিছু public goods দিত—যেমন ওপেন সি লেন, তুলনামূলক স্থিতিশীল আর্থিক ব্যবস্থা, এবং কালেকটিভ সিকিউরিটি। কিন্তু এখন সেই "বার্গেইন" আর কাজ করে না; শুধু compliance (নিয়ম মানা) আর আগের মতো "নিরাপত্তা" কিনে দেয় না।
পঞ্চমত, তিনি প্রস্তাব করেন "variable geometry"—অর্থাৎ সব ইস্যুতে একটাই স্থায়ী ব্লক/জোট নয়; বরং কমন ভ্যালু ও স্বার্থের ভিত্তিতে, বিভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন জোট গঠন করে কাজ করা। শেষত, কার্নির বক্তব্যকে অনেকে "uncharacteristically candid" (অস্বাভাবিক স্পষ্টবাদী) বলেছেন—এবং এর ফলে ট্রাম্পের সঙ্গে টেনশনও বেড়েছে; ট্রাম্প পরবর্তী সময়ে বলেছেন কানাডা "US-এর কারণে বেঁচে আছে", এবং কার্নির কথা প্রত্যাহার করতে বলেছেন। সারসংক্ষেপে, কার্নির বক্তব্য একটি বিষয়ই জোর দিয়ে প্রতিষ্ঠা করে: দাভোস ২০২৬-এ বিশ্ব নেতৃত্ব গ্লোবালাইজেশনের অবসান এবং নতুন এক multipolar (বহুকেন্দ্রিক) বিশ্বব্যবস্থার বাস্তবতা মেনে নিচ্ছে।
গ্লোবালাইজেশনের অবসান
আমি অনেকদিন ধরে যে কথাটা বলে আসছি, সেটাই এখন যেন চোখের সামনে বাস্তব হচ্ছে: বিশ্বজুড়ে যা ঘটছে, তাকে গ্লোবালাইজেশনের সমাপ্তি বলাই যুক্তিসঙ্গত। এবং এই গ্লোবালাইজেশন পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য—শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। অবশ্যই বিশ্ব বদলেছে; অংশীদারিত্বের মাধ্যমে মানবসভ্যতা যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা আমাদের একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার জন্য প্রস্তুতও করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো: পুরোনো বন্দোবস্তটি কীভাবে তৈরি হয়েছিল, এবং কেন তা এখন ভেঙে পড়ছে?
খুব সহজভাবে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব একটি নতুন "সিস্টেম" গড়ার জন্য কার্যত এক ধরনের সমঝোতায় পৌঁছেছিল। সেই সমঝোতায় ভূমিকা ভাগ হয়ে যায়। চীন হয়ে ওঠে বিশ্বের কারখানা। জাপান সুদের হার প্রায় শূন্য রেখে বৈশ্বিক ঋণদাতা হিসেবে ব্যবস্থা "তরল" রাখে। ইউরোপ হয়ে ওঠে প্রধান ক্রেতা ও ভোক্তা—তারা উৎপাদনশীলতা ও সামরিক শক্তির বিনিময়ে স্থিতিশীলতা ও সামাজিক কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেয়। আর এই পুরো ব্যবস্থার বলপ্রয়োগকারী চালক ছিল যুক্তরাষ্ট্র—যারা পেট্রো-ডলারকে কার্যত বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রার কেন্দ্রে বসায়, এবং এটিকে সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সের শক্তি দিয়ে সমর্থন করে।
সাইমন ডিক্সন এই ব্যবস্থাকে বলেছেন "Proof of Weapons Network"। এর মূল ভাবনা দাঁড়ায় এমন: কোনো দেশ যদি বাণিজ্য করতে চায়, অর্থনীতি গড়তে আন্তর্জাতিক পুঁজি ও বাজার-অ্যাক্সেস চায়, তাহলে তাকে কিছু মৌলিক নিয়ম মানতে হবে। নিয়মগুলো ছিল মূলত দুইটি: (১) জ্বালানি কিনতে ডলার ব্যবহার করতে হবে; (২) যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে হস্তক্ষেপ করা যাবে না। পেট্রো-ডলার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছিল যে জ্বালানি কিনতে গিয়ে বিশ্বের ডলারের চাহিদা থাকবে—আর সামরিক শক্তি এই কাঠামোকে প্রয়োজনে জোর করে টিকিয়ে রাখত। পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে এই কাঠামোকে কার্যকর রাখে।
ফলে নিয়ম মানলে বিনিয়োগের বাজার, বৈশ্বিক সাপোর্ট এবং নিরাপত্তা—এসবের সুবিধা মিলত। আর নিয়ম ভাঙলে শাস্তির পথ ছিল খোলা: নিষেধাজ্ঞা, কিংবা যুদ্ধের মতো কঠিন পরিণতি।
লাভ-ক্ষতির অসম চিত্র: K-আকৃতির অর্থনীতি এবং "চিরকালীন যুদ্ধ"
এই বন্দোবস্ত যে "সবার জন্য সমান লাভ" বয়ে এনেছিল—তা নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই এটি তৈরি করেছিল K-আকৃতির অর্থনীতি: ওপরের দিকে যারা (ধনী শ্রেণি/অ্যাসেট হোল্ডার) ছিল, তারা পরোক্ষভাবে বিপুল লাভ পেয়েছে। কারণ আমেরিকান কোম্পানিগুলো প্রচুর টাকা করেছে; বিনিয়োগকারী হলে আরও বেশি টাকা; এবং ফলে অনেকের জন্য "সুখে অবসর" বাস্তব হয়েছে।
কিন্তু এই ব্যবস্থাকে সচল রাখতে যে খরচ লুকানো ছিল, তা ভয়াবহ: এটি কার্যত চিরকালীন যুদ্ধ (forever war) দাবি করে—যা বিশ্বের জন্য খারাপ, এবং নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে দীর্ঘমেয়াদে ধ্বংসাত্মক। আর যুক্তরাষ্ট্রের গরিব ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। চাকরি গেছে বিদেশে; সাপ্লাই চেইন ও কারখানা সরে গেছে; সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে; মধ্যবিত্ত "ফাঁপা" হয়েছে; এবং অন্য দেশের উৎপাদনের ওপর এক ধরনের ভঙ্গুর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র জিনিস বানানো কমিয়ে দিয়ে বেশি করে "টাকা ও প্রযুক্তি" বানানোর দিকে ঝুঁকেছে—এবং এই অসম ভারসাম্যের চাপ সমাজের নিচের স্তরগুলোকে ক্রমেই সংকুচিত করেছে।
কেন এখন নিয়ম চাপানো যাচ্ছে না: নতুন ব্লকের উত্থান ও ক্ষমতার সীমা
এভাবে অনেকদিন চলেছে। কিন্তু এখন আমরা একটি মোড় পরিবর্তনের মধ্যে আছি। কিছু দেশ একত্রিত হয়ে কার্যত বলছে—"আমরা নিজেদের ব্যবস্থা তৈরি করব।" সমস্যা হলো, তারা এখন এত শক্তিশালী যে পুরোনো "Proof of Weapons Network" আগের মতো নিয়ম চাপাতে পারছে না—অন্তত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো সর্বগ্রাসী সংঘাতে না গিয়ে, যা বাস্তবে কেউই চায় না।
সুইজারল্যান্ডের সাম্প্রতিক ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে (দাভোস) আলোচনা খুবই স্পষ্ট: "খেলা শেষ।" গ্লোবালাইজেশন পশ্চিম ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যর্থ; এটিকে একটি ব্যর্থ নীতিই বলা যায়—সস্তা শ্রম খুঁজে অফশোরে উৎপাদন সরিয়ে দেওয়া, এবং এটাকে "বিশ্বের মঙ্গল" হিসেবে বিক্রি করা। বাস্তবে এতে যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশেষ করে আমেরিকান শ্রমিক শ্রেণি পিছিয়ে পড়েছে।
অর্থনৈতিক সূচকগুলোও ইঙ্গিতপূর্ণ। জাপান এখন মূলধন ফিরিয়ে আনছে এবং ইউএস ট্রেজারি বিক্রি করছে—অন্য দেশগুলোর মতোই। ফলত ডলার দুর্বল হচ্ছে, কারণ ডলারের শক্তি ধরে রাখতে "চিরকালীন চাহিদা" দরকার—যেটি এখন কমছে। ইউরোপও একটি তিক্ত শিক্ষা পেয়েছে: অন্যের ওপর জ্বালানি ও সামরিক নিরাপত্তা নির্ভর করলে, নিয়ম চাপানোর ক্ষমতা থাকে না।
এই প্রেক্ষাপটেই দাভোসে বড় প্রশ্ন উঠছে: নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ক্ষমতা কীভাবে ভাগ হবে? কারা খেলোয়াড়, তারা কী চায়, আর ভবিষ্যৎ কোন পথে যেতে পারে?
নতুন খেলায় চার খেলোয়াড়: কারা তারা, এবং কী চায়
নতুন বিশ্বব্যবস্থার ক্ষমতার লড়াইকে চারটি প্রধান গ্রুপে ভাগ করে দেখা যায়।
১) ফিনান্সিয়াল গ্লোবালিস্ট / ট্রান্সন্যাশনাল ক্যাপিটাল
এই গোষ্ঠীর কোনো দেশের প্রতি আনুগত্য নেই—আনুগত্য মূলত টাকার প্রতি। শীর্ষে আছে ব্ল্যাকরক, ভ্যানগার্ড, স্টেট স্ট্রিট—যারা ট্রিলিয়ন।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রকৌশলী
Comments