ইইউ–ভারত বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা
দুই দশকের বেশি সময় ধরে আলোচনার পর সম্পন্ন হওয়া ইইউ–ভারত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে অনেকেই 'মাদার অব অল ট্রেড ডিলস' বলে আখ্যা দিচ্ছেন। ভারতের জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এই চুক্তি এক গভীর সতর্কবার্তা, বিশেষত এমন এক সময়ে, যখন দেশটি ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে।
এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে টেক্সটাইল, পোশাক, চামড়া ও জুতার মতো খাতে প্রায় শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। জুতায় ১৭ শতাংশ এবং পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে ৯–১২ শতাংশ শুল্ক শূন্যে নেমে আসবে। ঠিক এই খাতগুলিই দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপে বাংলাদেশের রপ্তানি সাফল্যের মূল ভিত্তি।
বাংলাদেশের উত্থান অনেকটাই সম্ভব হয়েছিল এলডিসি হিসেবে ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং অনুকূল রুলস অব অরিজিন-এর কারণে। ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইইউর পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২১ শতাংশে পৌঁছায়, একই সময়ে চীনের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। অথচ ২০০৫ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের বাজার অংশ ছিল প্রায় সমান। দুই দশকে বাংলাদেশ এগিয়ে গেলেও ভারত পিছিয়ে পড়ে। এবার সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরিহাসের বিষয় হলো, যে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা বাংলাদেশের দ্রুত প্রবৃদ্ধিকে সম্ভব করেছিল, সেগুলোই এখন ক্ষয়ের মুখে। এলডিসি উত্তরণের পর তিন বছরের রূপান্তরকাল শেষে বাংলাদেশ যদি পূর্ণ এমএফএন শুল্কের আওতায় পড়ে, আর ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগীরা স্থায়ীভাবে শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করে, তাহলে ইউরোপীয় বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য আমূল বদলে যাবে। এমনকি বাংলাদেশ জিএনপি প্লাস সুবিধা পেলেও, সেফগার্ড বিধানের কারণে পোশাক খাতে শুল্ক ফিরে আসার ঝুঁকি থেকেই যায়।
সংখ্যাগুলো এই উদ্বেগকে আরও স্পষ্ট করে। বাংলাদেশ যেখানে ইউরোপে বছরে প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করে, যার ৯০ শতাংশের বেশি পোশাক। ভারতের রপ্তানি প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার এবং তা বহুমুখী। গবেষণা প্রতিষ্ঠান রেপিড-এর মডেলিং বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এলডিসি সুবিধা হারালে এবং একই সঙ্গে ভারতের শুল্কমুক্ত প্রবেশ কার্যকর হলে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৫.৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি কমতে পারে। আরও কঠোর পরিস্থিতিতে মোট রপ্তানি এক-তৃতীয়াংশের বেশি কমার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে চ্যালেঞ্জ কেবল শুল্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইইউ–ভারত চুক্তিতে কাস্টমস সহজীকরণ, নিয়ন্ত্রক সহযোগিতা ও মানদণ্ডের সামঞ্জস্যের মতো বিষয় রয়েছে, যা ভারতের লজিস্টিকস সুবিধা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে। এর পাশাপাশি ইউরোপের নতুন পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নসংক্রান্ত বিধি, যেমন কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম বাস্তবে কমপ্লায়েন্স সক্ষমতাকে নতুন বাণিজ্য বাধায় পরিণত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভারত এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে বিকল্প খুব বেশি নেই, কিন্তু করণীয় স্পষ্ট। প্রথমত, এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপীয় বাজারে পোশাক খাতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক ও বাণিজ্য অগ্রাধিকার দিতে হবে। জিএনপি প্লাস-এর আওতায় বাস্তবসম্মত রুলস অব অরিজিন আদায় এখন সময়ের দাবি। যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক নীতি শিথিলতা এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
দ্বিতীয়ত, রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে নিতে হবে। জ্বালানি সংকট, বন্দর জট, কাস্টমস অদক্ষতা,পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স-এসব দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান ছাড়া শুল্ক সুবিধা দিয়েও টিকে থাকা যাবে না। ভর্তুকি প্রত্যাহারকে ডব্লিউটিও সম্মতির নামে নিষ্ক্রিয়তা হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং ডব্লিউটিও-সম্মত রপ্তানি অর্থায়ন, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো নীতিগত স্থবিরতা। প্রতিবেদন ও কৌশলপত্রের অভাব নেই, কিন্তু বাস্তব সংস্কার নেই। বৈশ্বিক বাণিজ্য দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল না মেলালে, বাংলাদেশের রপ্তানি সাফল্য ইতিহাস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
Comments