আড়াই গুণ বেতন, তিন গুণ দুশ্চিন্তা
সরকারি কর্মচারীদের জন্য সুখবর -এমন বাক্য দিয়ে লেখাটি শুরু হলে আপাতদৃষ্টিতে আপত্তির কিছু থাকে না। রাষ্ট্র তো তার কর্মীদের সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করবেই। কিন্তু সুখবরটি যখন আড়াই গুণ বেতন বৃদ্ধি, ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত মাইনে লাফ, আর তার অভিঘাত গিয়ে পড়ে গোটা অর্থনীতির ওপর, তখন সেই সুখবর আর সবার জন্য সুখের থাকে না। বরং তা রূপ নেয় আতঙ্কে, অনিশ্চয়তায় এবং ভবিষ্যৎ সংকটের আশঙ্কায়।
নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সর্বনিম্ন মূল বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা থেকে এক লাখ ৬০ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব এসেছে। সঙ্গে ভাতাও দ্বিগুণের বেশি। অর্থাৎ সরকারি চাকরিজীবীদের আয় হুঁ হুঁ করে বাড়বে। প্রশ্ন একটাই-দেশের বাকি মানুষরা যাবেন কোথায়?
যে দেশে সাধারণ মানুষের আয় স্থবির, অনেকেরই কোনো আয় নেই, বেসরকারি খাত চাকরি কমাচ্ছে, মজুরি বাড়াতে পারছে না, যেখানে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মধ্যবিত্তের সংসার হাঁসফাঁস করছে-সেই দেশে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য এমন বিশাল আয়বৃদ্ধি সামাজিক ভারসাম্যকে নাড়িয়ে দেবে, এ কথা বুঝতে অর্থনীতিবিদ হতে হয় না। বাজারের নিয়ম বড়ো নিষ্ঠুর। যাদের হাতে অতিরিক্ত টাকা যাবে, তারা ব্যয় বাড়াবে। ফলাফল-দাম বাড়বে। সেই দাম বাড়ার বোঝা বহন করবে কারা? সরকারি চাকরিজীবী নয়, বহন করবে সাধারণ মানুষ।
এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ বছরে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত এক লাখ কোটি টাকা লাগতে পারে। অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণ ব্যয়। অর্থ উপদেষ্টা নিজেই বলেছেন, এই দায় পরবর্তী সরকারকে নিতে হবে। অর্থের সংস্থানও পরবর্তী সরকারকেই করতে হবে। এখানেই মূল প্রশ্নটি উঠে আসে-তাহলে এই সিদ্ধান্ত এখন কেন? অন্তর্বর্তী সরকার কেন ভবিষ্যৎ সরকারের ঘাড়ে এমন বিশাল আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে?
সরকারি ব্যয়ের বাস্তব চিত্র ভয়ংকর। রাজস্ব আয় বাড়ছে ধীরগতিতে, ব্যয় বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। গত পাঁচ বছরে রাজস্ব আয় বেড়েছে ৩৫ শতাংশ, অথচ ঋণ বেড়েছে ৪২ শতাংশ। শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই ঋণ নিতে হয়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এই অবস্থায় নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে যদি আরও এক লাখ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়, তবে সরকার যাবে কোথায়? ঋণই হবে শেষ ভরসা। আর ঋণের সুদ, তা আবার পরিচালন ব্যয়ের ঘাড়ে চেপে বসবে।
এর সবচেয়ে বড়ো ভুক্তভোগী হবে উন্নয়ন খাত। ইতিমধ্যেই উন্নয়ন ব্যয় কমছে, বাড়ছে বেতন-ভাতা আর ঋণের সুদের খরচ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, ভর্তুকি, সামাজিক সুরক্ষা-এসব খাতে ব্যয় কমানোর সুযোগ নেই। ফলে অর্থনীতির অক্সিজেন খ্যাত উন্নয়ন ব্যয় আরও সংকুচিত হবে। রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল, কর্মসংস্থান-সবই হবে প্রশ্নবিদ্ধ।
আরেকটি বড়ো প্রশ্ন-এই বেতন বৃদ্ধির বিনিময়ে রাষ্ট্র কী পাচ্ছে? সরকারি সেবার মান কি বাড়ছে? স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন-এসব কি নিশ্চিত হচ্ছে? বাস্তবতা হলো, বেতন বাড়ালেই সেবা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভালো হয় না। তার জন্য প্রয়োজন সংস্কার, কঠোর নজরদারি, কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন। সেই জায়গায় রাষ্ট্র বরাবরের মতোই নীরব।
ফলে যে ছবি ফুটে ওঠে, তা অত্যন্ত বৈষম্যমূলক। একদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের আয়ের পাহাড়সম বৃদ্ধি, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের সংকট, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার অবনতি। এটি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক অস্থিরতারও রেসিপি।
সরকারি কর্মচারীরা ভালোভাবে বাঁচবেন –এ প্রত্যাশা সবার। কিন্তু রাষ্ট্র যদি সেই ভালো থাকার খরচ সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দেয়, ভবিষ্যৎ সরকারকে খাদের কিনারায় ঠেলে দেয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তকে সুখবর বলা যায় না। বরং এটিকে বলা যায়-আড়াই গুণ বেতন, তিন গুণ দুশ্চিন্তা।
Comments