ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াতের মতানৈক্যে ইসলামী ভোট-ব্যারোমিটার
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে প্রায় এক যুগ ধরে নানাবিধ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল একক ভোট শুশ্রূষার ধারণা, অর্থাৎ ইসলামী সমর্থকদের ভোট এক বাক্সে জড়ো করা। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট থেকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বেরিয়ে যাওয়ার পর সেই স্বপ্ন প্রকৃত নির্বাচনী মাঠে এখন ভেঙে পড়েছে, ফলস্বরূপ ভোট তিনটি ভাগে বিভক্ত হওয়ার প্রকোপ দেখা যাচ্ছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, যা সাধারণভাবে চরমোনাই পীর বা শাইখে সিরাজী মতলবের অনুসারী ভ্যান্টেড গ্রুপ হিসেবে পরিচিত, জানিয়েছে তারা জামায়াত-নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ইসলামী ঐক্য থেকে বেরিয়ে নিজেদের ভোটচিন্তা ও নীতি বাস্তবায়নের জন্য এককভাবে নির্বাচনে বসবে এবং ২৬৮টি আসনে প্রার্থী দেবে। বাকি ৩২ আসনে তারা পছন্দের কোনো প্রার্থীকে সমর্থন করবে বলে ঘোষণাও দিয়েছে।
দলের নেতারা বলেছেন যে তারা জোটে থাকলে তাঁদের ভোট শুদ্ধভাবে "এক বাক্সে" রাখতে পারবে না, বরং অন্যান্য দলের সঙ্গে বসে দলগত স্বার্থে যে আসন-বণ্টন নির্ধারিত হচ্ছে তা আচরণগতভাবে ইসলামি আদর্শের প্রতি সঙ্গত নয়।
অন্যদিকে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের অন্তর্গত অন্যান্য দল, বিশেষত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি), চোরমোনাই পীরের সিদ্ধান্তকে 'অপ্রত্যাশিত' ও 'অনুকূল নয়' বলে অভিহিত করেছে এবং তারা বিশ্বাস করে যে জয়লাভের সম্ভাবনা বাড়াতে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করা উচিত ছিল।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের পেছনে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। এই সিদ্ধান্ত কী রাজনৈতিকভাবে বাস্তবসম্মত? আসলে ইসলামি আন্দোলনের লাভ-ক্ষতির বিষয়টি একদম সরল নয় এবং তা কিছু মাত্রিক দিক থেকে বিচার করা যায়:
১. স্বতন্ত্র পরিচিতি ও নীতি সংরক্ষণ
ইসলামী আন্দোলন দাবি করেছে যে, তারা ইসলামী নীতির প্রতি বেশি কায়েমাচ্ছন্ন দল। জামায়াত জোটে থাকতে থাকলে তাদের নিজস্ব পরিচিতি ও নৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। স্বতন্ত্র হওয়ার কারণে তারা তাদের নিজস্ব নির্বাচনি ইস্যু ও রাজনৈতিক অবস্থান অনেক বেশি স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারবে-বিশেষত তাদের নীতিগত বিষয়ে যারা বিশ্বাসী ভোটার আছে, তাদের কাছে এটি একটি সুস্পষ্ট বার্তা।
২.জোটের অ্যাজেন্ডা থেকে মুক্তি
জোটে থাকার সময় ইসলামি আন্দোলনকে ভারসাম্য করতে হতো জামায়াতের সাথে। কিছু ক্ষেত্রে তাদের কাছে পানিতে নোঙর টানতে হতো পৃষ্ঠপোষক দলের রাজনৈতিক কৌশল ও সিদ্ধান্তসমূহকে। কিন্তু এখন তারা যেহেতু স্বাধীন, তাই নিজস্ব চরিত্র ধরে রাখতে পারবে এবং রাজনৈতিক আপোস থেকে দূরে থাকতে পারবে বলে দাবি করছে। এটা তাদের নৈতিক অবস্থানকে শক্ত করতে পারে নিজের অনুসারীদের কাছে।
৩. ভোটের বিভাজন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
স্বতন্ত্রভাবে লড়াই করলে সব ইসলামি ভোট এক জায়গায় না জমে তিনটি ভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে। ভোট বিভাজিত হবে ইসলামি আন্দোলন, জামায়াত-এনসিপি-খেলাফত এবং বিএনপির মধ্যে। এটি বাস্তবে ইসলামি ভোট শক্তিকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে এবং এক বাক্সে ভোটের জেতার ধারণাকে দুর্বল করে। ফলস্বরূপ, একটি বড় বিরোধী রাজনৈতিক দলের যেমন বিএনপি, যে ইসলামী ভোটের কিছু অংশের সাথে ঐক্য গড়ে তুলেছে, তাকে নির্বাচনী সুবিধা আসতে পারে।
এভাবে বাইরে থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার অর্থ প্রথাগত অনুগত ভোটারি ভিত্তি হয়তো কিছুটা রক্ষিত হবে, কিন্তু সরকারের পক্ষে নির্বাচনে প্রভাবী পদ লাভের সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। এটা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণ হয়ে এসেছে যে ছোট গোষ্ঠী ভোটে বিচ্ছিন্ন থাকলে বড় দলের সামনে তাদের প্রভাবাধিক্য ক্ষীণ হয়।
কেন ধর্মীয় দলগুলির একে-অপরের সাথে সমঝোতা কঠিন?
১.নীতিগত পার্থক্য ও ব্যক্তিগত ক্ষমতার স্বার্থ
ইসলামী দলগুলো নিজেদের অবস্থান ও আদর্শকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। কিন্তু আদর্শ মনে হলেও রাজনৈতিক জটিলতায় অনেক সময় নীতিগত পার্থক্য ব্যক্তিগত নেতৃত্ব, ক্ষমতা ভাগাভাগি বা আসন বণ্টনের মতো কৌশলে রূপান্তরিত হয়। জামায়াত ও ইসলামি আন্দোলনের মধ্যে আসন-সংখা ও ক্ষমতার ওপর মতানৈক্য এসব পার্থক্যের বাইরে অধিকাংশ সময়ই বাস্তব রাজনৈতিক স্বার্থ ও নেতৃত্বের কৌশলগত বিবেচনার ইঙ্গিত বহন করে।
২. ইতিহাস ও পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাব
জামায়াত ও ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে পারস্পরিক সমালোচনা এবং বিশ্বাসের অভাবের ইতিহাস রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে উভয়ের মাঝে নানা রাজনৈতিক দিক নিয়ে টানাপোড়েন দেখা গেছে, যা আদর্শের অভাব নয় বরং দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত মতানৈক্য ও ক্ষমতার টানাপোড়েনের প্রতিফলন।
৩. বড়-ছোট দলের সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক কৌশল
জামায়াত একটি পুরনো ও সুসংগঠিত দল হলেও বহু ভোটার তাকে স্মরণ করে মুক্তিযুদ্ধে দলটির অবস্থান ও ইতিহাসের কারণে। অনেক প্রশ্নে এই দল বিতর্কিত। স্বতন্ত্র দলগুলির অনেকে এই দাগ থেকে আলাদা থাকতে চায়, ফলস্বরূপ বড় জোটের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট ত্যাগ করে স্বতন্ত্রভাবে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি ও নীতিগত স্বচ্ছতার দাবি দিয়ে। কিন্তু এই পদক্ষেপ শুধু নৈতিক নয়, রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও প্রভাব ফেলবে: ইসলামি ভোট তিন ভাগে বিভক্ত হবে এবং এটি বড় দলগুলোর পক্ষে সুবিধাজনক হতে পারে। আদর্শগত মিল থাকলেও ব্যক্তিগত, কৌশলগত ও ক্ষমতা-ভিত্তিক মনস্তাত্ত্বিক কারণে ইসলামি দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে ব্যর্থ হচ্ছে। এক বাক্সে ভোটের কথা থাকলেও মাঠে তিন বাক্স দেখা যাচ্ছে - এটাই হতে পারে তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরাজয়।
Comments