সৌদি আরবে স্বর্ণের বিশাল ভান্ডার, গড়ে উঠবে বিশ্বমানের ‘গোল্ড ফ্র্যাঞ্চাইজি’
সৌদি আরবে এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী সাফল্যের ঘোষণা দিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় খনি কোম্পানি 'মাআদেন'। দেশের চারটি কৌশলগত স্থানে নতুন করে প্রায় ৭৮ লাখ আউন্স (২ লাখ ২১ হাজার কেজির বেশি) স্বর্ণের মজুত খুঁজে পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে কোম্পানিটি। এই বিশাল আবিষ্কার সৌদি আরবের খনিজ সম্পদ আহরণ এবং বিশ্বমানের একটি 'গোল্ড ফ্র্যাঞ্চাইজি' গড়ার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
মাআদেনের ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও ড্রিলিং কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে ৯০ লাখ আউন্সের বেশি স্বর্ণের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছিল। পরে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বার্ষিক রিপোর্টিং ফ্যাক্টরের সঙ্গে সমন্বয় করার পর নিট ৭৮ লাখ আউন্স স্বর্ণের মজুত চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই বিপুল মজুত মূলত চারটি প্রধান অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে:
মানসুরা মাসারাহ : এটি বর্তমানে মাআদেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বর্ণ প্রকল্প। গত এক বছরে এখানে এককভাবে ৩০ লাখ আউন্স স্বর্ণের মজুত বেড়েছে।
ওয়াদি আল জাও : এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন আবিষ্কৃত অঞ্চল। প্রথম পর্যায়ের ড্রিলিংয়েই এখানে ৩০ দশমিক ৮ লাখ আউন্স স্বর্ণের সন্ধান মিলেছে। এই আবিষ্কারে ভূতাত্ত্বিকেরাও অবাক হয়েছেন।
উরুক ২০/২১ ও উম্ম আস সালাম: আরবের মধ্যাঞ্চলের খনিগুলো থেকে যৌথভাবে ১৬ দশমিক ৭ লাখ আউন্স স্বর্ণের মজুত নিশ্চিত করা হয়েছে।
২০২৫ সালে সোনার দামে এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক উত্থান দেখা গেছে। মূল্যবান ধাতুটির মূল্যের বার্ষিক বৃদ্ধি ৬৪ শতাংশের বেশি ছিল। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বিনিয়োগ তহবিল থেকে চাহিদা উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির কারণে এই উত্থান ঘটেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদেরা। রেকর্ড অনুসারে, ২০২৫ সালে প্রতি আউন্স সোনার গড় দাম ৩ হাজার ৪০০ ডলার থেকে ৩ হাজার ৫০০ ডলারের মধ্যে ছিল। এর মধ্যে ডিসেম্বরে সোনার দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছিল— প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৫০০ ডলার।
মাআদেনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বব উইল্ট এই সাফল্যকে কোম্পানির বৈশ্বিক অগ্রযাত্রার মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, 'এই ফলাফল কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি ড্রিলিং এবং বিনিয়োগ কৌশলের বাস্তব প্রতিফলন। আমরা সৌদি আরবের ভূগর্ভস্থ সম্পদকে উন্মোচন করতে যে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছি, এটি তারই ফল।'
উইল্ট আরও জানান, এই ক্রমবর্ধমান মজুত সরাসরি কোম্পানির ভবিষ্যৎ নগদ অর্থ প্রবাহ বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। এর ফলে মাআদেন কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বিশ্ববাজারের অন্যতম শীর্ষ খনিজ সরবরাহকারী হিসেবে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করবে।
সৌদি আরবের 'অ্যারাবিয়ান শিল্ড' অঞ্চলটি খনিজ সম্পদে কতটা সমৃদ্ধ, তা এই আবিষ্কারের মাধ্যমে পুনরায় প্রমাণিত হলো। মাআদেনের অনুসন্ধানী দল কেবল স্বর্ণ নয়, বরং তামা ও নিকেলের মতো আধুনিক শিল্পের জন্য অপরিহার্য ধাতুরও ব্যাপক উপস্থিতি পেয়েছে। শায়বান এবং জাবাল আল ওয়াকিলে তামা ও নিকেলের প্রাথমিক ড্রিলিং ফলাফল অত্যন্ত ইতিবাচক।
মাআদেনের লক্ষ্য হলো স্বর্ণের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী 'মাল্টি-কমোডিটি' পোর্টফোলিও তৈরি করা। সৌদি আরবকে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রশাসন।
মাআদেনের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প 'মানসুরা মাসারাহ' এখন এক বিশাল খনিজ ভান্ডারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এখানে মোট মজুত ১০ দশমিক ৪ মিলিয়ন আউন্স স্বর্ণ। আকরিকের মানও বেশ ভালো: প্রতি টন আকরিকের বিপরীতে গড়ে ২ দশমিক ৮ গ্রাম স্বর্ণ পাওয়া যাচ্ছে।
ভূতাত্ত্বিকেরা জানিয়েছেন, খনিজ স্তরটি ভূগর্ভের অনেক গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এখনো প্রকৃত গভীরতা নির্ণয় করা যায়নি। অর্থাৎ ২০২৬ সালজুড়ে চলমান ড্রিলিংয়ে এই মজুত আরও বাড়তে পারে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন ২০৩০-এর একটি অন্যতম স্তম্ভ হলো খনি শিল্প। তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে খনিজ সম্পদকে আয়ের তৃতীয় প্রধান উৎস হিসেবে গড়ে তোলাই এর লক্ষ্য। মাআদেনের এই স্বর্ণ আবিষ্কার কেবল একটি কোম্পানির সাফল্য নয়, বরং এটি সৌদি আরবের জাতীয় অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণের পথে কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।
তথ্যসূত্র: গালফ নিউজ, আরব নিউজ
Comments