যেখানে তেল বা খনিজ সম্পদ, সেখানেই আমেরিকার দস্যুতা
বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে এক অদ্ভুত মিল বারবার চোখে পড়ে। যেখানে বিপুল খনিজ তেল, গ্যাস বা প্রাকৃতিক সম্পদ, সেখানেই কোনও না কোনও সময় হাজির হয়েছে মার্কিন হস্তক্ষেপ, সামরিক আগ্রাসন কিংবা গুপ্তচরবাহিনীর ছায়াযুদ্ধ। গণতন্ত্র, মানবাধিকার বা সন্ত্রাস দমনের মতো চকচকে শব্দে সেই আগ্রাসনকে মোড়ানো হলেও ইতিহাস বলছে, আসল লক্ষ্য প্রায়শই একটাই- 'তরল সোনা'।
সাম্প্রতিক কালে ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে মার্কিন তৎপরতা সেই পুরোনো চিত্রকেই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। মাদক-সন্ত্রাস দমনের অজুহাতে কারাকাসে ঢুকে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেফতার করার কাহিনি যদি সত্যি হয়, তা হলে প্রশ্ন উঠবেই - লাতিন আমেরিকার এই দেশে হঠাৎ করে আমেরিকার এত আগ্রহ কেন? উত্তর লুকিয়ে রয়েছে ভেনেজুয়েলার মাটির নীচে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল ভাণ্ডার।
এই গল্প নতুন নয়। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকেই 'তেলের জন্য ক্ষমতাবদল'-এর নীলনকশা তৈরি করেছিল ওয়াশিংটন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা বুঝে গিয়েছিল, আধুনিক সভ্যতার রক্তস্রোত হচ্ছে তেল। যে দেশ এই সম্পদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, ভবিষ্যতের বিশ্ব রাজনীতিতে তার হাতই থাকবে উপরে। সেই উপলব্ধি থেকেই শুরু হয় পশ্চিম এশিয়া ও লাতিন আমেরিকাকে ঘিরে মার্কিন কৌশল।
এর প্রথম বড়ো উদাহরণ ইরান। ১৯৫১ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ মোসাদ্দেক সাহস করে ইরানি তেলকে জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ব্রিটিশ কোম্পানির শতাব্দী প্রাচীন লুট বন্ধ করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। এর ফলে রাতারাতি তিনি হয়ে ওঠেন জনতার নায়ক। কিন্তু এই সিদ্ধান্তই হয়ে দাঁড়ায় তাঁর সর্বনাশের কারণ। ব্রিটেনের অনুরোধে সিআইএ ও এমআই সিক্স যৌথ ভাবে চালায় 'অপারেশন আজাক্স'। গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করে ক্ষমতায় ফেরানো হয় শাহ রেজা পহেলভিকে। তেল আবার চলে যায় পশ্চিমি কোম্পানির হাতে। মোসাদ্দেকের ভাগ্যে জোটে কারাবাস ও গৃহবন্দিত্ব।
এই একটি ঘটনাই প্রমাণ করে দেয় গণতন্ত্র নয়, ওয়াশিংটনের আসল চিন্তা ছিল তেলের অবাধ সরবরাহ। পরবর্তী আড়াই দশক ইরানের তেল থেকে বিপুল মুনাফা তোলে পশ্চিমি সংস্থাগুলি, আর তার বিনিময়ে ইরান পায় এক দমনমূলক রাজতন্ত্র।
১৯৭৯ সালের ইসলামীয় বিপ্লব সেই হিসাব ওলটপালট করে দেয়। খোমেনির সরকার তেলকে ফের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনে। এর পর থেকেই শুরু হয় আমেরিকা-ইরান চরম শত্রুতা। সামরিক আগ্রাসন না হলেও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতিকে কার্যত পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা চলে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে, অথচ ওয়াশিংটনের কাছে সেটাই যেন ছিল গ্রহণযোগ্য মূল্য।
ইরানের পর তালিকায় আসে ইরাক। সাদ্দাম হুসেন যখন ঘোষণা করলেন, ডলারের বদলে ইউরোয় তেল বিক্রি হবে, তখনই বিপৎসংকেত বেজে ওঠে ওয়াশিংটনে। পেট্রোডলারের ভিত নড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আমেরিকার কাছে ছিল অমার্জনীয় অপরাধ। ফলাফল, ২০০৩ সালে 'অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম'। গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অজুহাত তুলে একটি সার্বভৌম দেশ ধ্বংস করা হল। আজ পর্যন্ত সেই অস্ত্রের কোনও অস্তিত্ব মেলেনি, কিন্তু ইরাকের তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বহুজাতিক কোম্পানির হাতে।
এই তালিকা আরও দীর্ঘ লিবিয়া, সিরিয়া আফগানিস্তান, এমনকি আফ্রিকার বহু দেশ। কোথাও সরাসরি সেনা পাঠানো হয়েছে, কোথাও নিষেধাজ্ঞা, কোথাও আবার 'রঙিন বিপ্লব'-এর ছদ্মবেশে সরকার বদলের চেষ্টা। পদ্ধতি বদলেছে, উদ্দেশ্য বদলায়নি।
মার্কিন প্রশাসন বারবার দাবি করে, তারা বিশ্বে গণতন্ত্র রক্ষা করতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন হল, গণতন্ত্র কি শুধুই তেলসমৃদ্ধ দেশগুলির ক্ষেত্রেই বিপন্ন হয়ে পড়ে? দরিদ্র অথচ সম্পদহীন কোনও স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কেন সেই একই উদ্যম দেখা যায় না?
সম্প্রতি ইউক্রেন যুদ্ধ বন্দের নামে দেশটি খনিজ সম্পদের ভাগ চেয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাকিস্তানে তেলের অনুসন্ধানও করছে তার নিজস্ব নিয়ন্ত্রণাধীণ মার্কিন কোম্পানি।
আসলে বিশ্ব রাজনীতিতে নৈতিকতা প্রায়শই শক্তির কাছে পরাজিত হয়। খনিজ সম্পদ হয়ে ওঠে ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি। আর সেই চাবিকাঠি নিজের হাতে রাখতে গিয়েই আমেরিকা বারবার আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের জীবনকে উপেক্ষা করেছে।
ভেনেজুয়েলা আজ সেই একই চক্রে পড়ার আশঙ্কায়। ইতিহাস যদি কোনও শিক্ষা দেয়, তা হল— যেখানে তেল বা খনিজ সম্পদ, সেখানেই আমেরিকার আগ্রহ নিছক কূটনৈতিক নয়। তা প্রায়শই দস্যুতার রূপ নেয়। প্রশ্ন একটাই- এই লুটের রাজনীতি কবে থামবে, আর বিশ্ব কবে সত্যিকারের স্বাধীনতা ও ন্যায়ের পথে হাঁটবে?
Comments