নতুন বছর, পুরোনো চাওয়া
আরও একটি নতুন বছর এসে হাজির হলো আমাদের জীবনে। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে আমরা সবাই পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানাই, কামনা করি সুস্থতা, শান্তি আর সমৃদ্ধির। কিন্তু নতুন বছরকে সত্যিকার অর্থে অর্থবহ করে তুলতে হলে শুধু শুভেচ্ছা বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে না।
প্রয়োজন নতুন করে ভাবা, নিজের আচরণ ও মানসিকতার দিকে তাকানো এবং জীবনের কিছু বুনিয়াদি শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা। পরিমিতিবোধ, ভারসাম্য, সহিষ্ণুতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান - এই মূল্যবোধগুলো চর্চার মধ্য দিয়েই একটি বছর আমাদের জন্য ভালো হতে পারে।
এবারের বর্ষবরণে উৎসবের আমেজ তুলনামূলকভাবে কম। জাতীয় জীবনে শোকের ছায়া, অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা, কর্মহীন ও রোজগারহীন মানুষের দীর্ঘ সারি, সমাজে সহিংসতা ও অস্থিরতার বিস্তার- সব মিলিয়ে বিদায়ী বছর খুব বেশি স্বস্তি দিতে পারেনি। বহু মানুষ এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এই বাস্তবতায় জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব নয়, বরং সংযমী মনোভাবই যেন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
তবু নতুন বছর মানেই নতুন সম্ভাবনা। হতাশার মধ্যেও সামনে তাকানোর সুযোগ। এই বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিঃসন্দেহে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন - গণতন্ত্রের উৎসব। ১২ ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশ নতুন সরকার বেছে নিতে যাচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এই নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ ও টানাপড়েন বাড়বে,সেটাই স্বাভাবিক। ইতিমধ্যেই তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। রাজনীতির পারদ চলতি মাস থেকেই ধাপে ধাপে আরও চড়বে।
গণতন্ত্র মানেই মতভেদ, বিতর্ক আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা। নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়বে, এটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সমস্যাটা তৈরি হয় তখনই, যখন এই উত্তেজনা রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়িয়ে সমাজের অন্যান্য স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। রাজনীতি আর ব্যক্তিগত জীবনকে একাকার করে ফেলা, রাজনৈতিক মতভেদের কারণে সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট করা বা ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখা - এসব কোনোভাবেই সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির লক্ষণ নয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক লড়াই মূলত আদর্শ ও নীতির লড়াই, মানুষের সঙ্গে মানুষের শত্রুতা নয়। নির্বাচন আসে-যায়, সরকার বদলায়, কিন্তু সমাজে আমরা সবাই একসঙ্গে বাস করি। তাই রাজনৈতিক উত্তাপকে রাজনৈতিক পরিসরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব। সহিষ্ণুতা ও সংযম ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হতে পারে না।
নতুন বছর মানে শুধু সময়ের হিসাবে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া নয়; চিন্তা ও আচরণেও এগোনোর সুযোগ। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও সেই অগ্রগতির ছাপ থাকা জরুরি। আমরা কি আগের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিতে পারব? আমরা কি ভিন্নমতকে সম্মান করতে শিখব? আমরা কি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চর্চা করব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে নতুন বছর আমাদের জন্য কতটা কল্যাণ বয়ে আনবে।
নতুন বছরের প্রথম দিনে তাই একটি স্পষ্ট সংকল্প নেওয়া যেতে পারে। আমরা যেন কথায় ও কাজে পরিমিতিবোধ বজায় রাখি, উত্তেজনার বদলে যুক্তিকে প্রাধান্য দিই, বিভেদের বদলে সহনশীলতার চর্চা করি। গণতন্ত্রের এই বৃহত্তর উৎসবে অংশ নিতে গিয়ে যেন আমরা মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ ভুলে না যাই।
বছর নতুন, কিন্তু আমাদের চাওয়া পুরোনো। শুধু ক্যালেন্ডারের তারিখ বদল নয়, বদল চাই আমাদের ভেতরের আবহাওয়ায়।
চাই সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বিশৃঙ্খলার অবসান, যেখানে আইন হবে শক্তির চেয়ে বড়, বিবেক হবে প্রতিহিংসার চেয়ে দৃঢ়। চাই সেই দিন,যেদিন রাস্তায়,পর্দায়,কথোপকথনে মবের হুংকার নয়, শোনা যাবে মানুষের কণ্ঠ।
মব সহিংসতা থেকে মুক্তি চাই, কারণ ভিড় যখন মুখহীন হয়ে ওঠে,মানুষ তখন মানুষ থাকে না। অন্ধ রাগের মিছিলে পিষ্ট হয় ন্যায়,মানবতা আর ভবিষ্যৎ। আমরা চাই না আর কোনো তরুণ উন্মত্ততার হাত ধরে অমানবিক হয়ে উঠুক।
চাই গালির সংস্কৃতির পরিবর্তন। শব্দ তো নির্মাণের হাতিয়ার, কিন্তু আমরা তাকে বানিয়েছি অস্ত্র। গালির আঘাতে প্রতিদিন ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে একটি প্রজন্মের মনন,ভেঙে পড়ছে সংলাপের সেতু, বিষাক্ত হয়ে উঠছে মতভিন্নতার ভাষা। এই বিষ থেকে মুক্তি চাই।
কারণ এসব গালিবাজদের ছায়ায় ধীরে ধীরে মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ছে প্রজন্ম, তারা শিখছে জিততে হলে চিৎকার করতে হয়, ভিন্নমত মানেই শত্রু, আর শক্তি মানেই অন্যকে দমিয়ে রাখা। এই শিক্ষার বদল চাই।
চাই প্রতিহিংসার চর্চার অবসান। কারণ প্রতিহিংসা কখনো ন্যায় আনে না,শুধু নতুন করে ক্ষত তৈরি করে। আমরা চাই প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের পথ; রক্তচক্ষু নয়,ন্যায়ের আলো।
সবচেয়ে বেশি চাই ন্যায্যতা, যে ন্যায্যতা প্রশ্ন করতে শেখায়,শুনতে শেখায়,ভুল হলে স্বীকার করতে সাহস দেয়। যেখানে শক্তিমান নয়, ন্যায়বানই হবে শেষ কথা।
এই নতুন বছরে তাই আমাদের প্রার্থনা একটাই - শব্দ হোক মানবিক,ভিড় হোক সচেতন,ক্ষমতা হোক দায়িত্বশীল আর ভবিষ্যৎ হোক এমন এক জায়গা, যেখানে মানুষ মানুষ হয়ে বাঁচতে পারে।
আসুন, এই নতুন বছরকে কেবল আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সত্যিকার অর্থেই অগ্রগতির প্রতীক করে তুলি। আমরা সামনে এগোব, পিছনের দিকে নয়। এই বিশ্বাস নিয়েই নতুন বছরকে বরণ করি। সবাই ভালো থাকি, সবাইকে ভালো রাখি, আর সম্মিলিত চেষ্টায় নতুন বছরকে আনন্দ ও শান্তির বছরে রূপান্তরিত করি।
Comments