আজ জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস, ফিরে দেখা ১৯৭৫
ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক বার্তা দিতে চায় বিএনপি। ১৯৭৫ সালের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকার সামনে আনতে চায় দলটি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো শক্তি যেন জনগণের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করতে কিংবা বাংলাদেশকে অন্য কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, সেই বার্তাও দিতে চায় বিএনপি।
দিবসটি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া বাণীতে উঠে এসেছে—'দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ' স্লোগান। বিএনপির মতে, জাতীয় স্বার্থ, স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এই অবস্থানই তাদের রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বিএনপির কাছে এবারের ৭ নভেম্বর তাই কেবল অতীতের একটি ঘটনা স্মরণের দিন নয়। বরং ঐতিহাসিক এই দিবসের চেতনাকে বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালনা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকারে রূপ দিতে চায় দলটি।
দীর্ঘ বিরতির পর এবার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালিত হচ্ছে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্যে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জাতীয় ঐক্য এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনায় অংশ নেওয়া সিপাহি ও দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি দিনটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, ওই সময় সিপাহি-জনতার সম্মিলিত উদ্যোগে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পথ তৈরি হয়। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে জনগণের সমর্থনে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতে ৭ নভেম্বরকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যারা দেশকে পরনির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তাদের সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর মর্যাদা ও গৌরব রক্ষায় ওই দিনের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে ৭ নভেম্বর
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা। ওই সময় সেনাবাহিনীর ভেতরে একাধিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের কারণে রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ৩ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান বন্দি হন। চার দিন পর ৭ নভেম্বর সেনাসদস্যদের বিদ্রোহ এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে তিনি মুক্তি পান।
সেদিনের ঘটনাপ্রবাহে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মীদের ভূমিকাও ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। বিশেষ করে কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বাধীন জাসদের গণবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। ওই ঘটনার পর দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে আসেন জিয়াউর রহমান।
বিএনপি দিনটিকে সিপাহি-জনতার বিপ্লব হিসেবে আখ্যায়িত করে। দলটির দৃষ্টিতে, এটি ছিল জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সংহতি রক্ষায় সেনাবাহিনী এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের প্রতীক।
দীর্ঘ বিরতির পর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
বিভিন্ন সময়ে ৭ নভেম্বরের সরকারি ছুটি ও রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের বিষয়ে পরিবর্তন এসেছে। বিএনপি সরকারের আমলে দিবসটির সরকারি ছুটি পুনর্বহাল করা হলেও পরবর্তী সময়ে তা বাতিল করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দিনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়নি।
২০২৬ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং সরকারি ছুটি পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে এবারের দিবসটি রাজনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় আয়োজনের দিক থেকেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
সাত দিনের কর্মসূচি
দিবসটি উপলক্ষে ৫ থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত সাত দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে শনিবার সকালে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। পরে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে বের হবে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।
অতীতের শিক্ষা থেকে ভবিষ্যতের রাজনীতি
৭ নভেম্বরের চেতনাকে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে নতুন বার্তা দিতে চায় বিএনপি। দলটির নেতাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, অতীতের রাজনৈতিক ভুল ও প্রতারণার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে জনগণকে সচেতন রাখা জরুরি।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল গণ্মাধ্যমকে বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বকীয়তা এবং বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয় মুছে দেওয়ার ষড়যন্ত্র হয়েছিল বলে তাঁদের দল মনে করে। সেই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর একটি অংশ বন্দি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে। পরে সাধারণ মানুষের সমর্থনে তিনি সেনানিবাসের বাইরে আসেন। তাঁর মতে, সেদিনের ঘটনাপ্রবাহে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রত্যয় আরও দৃঢ় হয়।
তিনি আরও জানান, অতীতে বাংলাদেশে যেসব ভুল ও প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে জাতিকে সচেতন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির পাশাপাশি সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের চেতনার যোগসূত্র রয়েছে। এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাই এবারের ৭ নভেম্বরের নতুন রাজনৈতিক বার্তা।
Comments