কার্যক্রম শুরু সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের: আমানত ফেরতের চাপ সামলে আস্থা পুনর্গঠনের পরীক্ষা
আজ থেকে একপ্রকার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে পাঁচটি দুর্বল শরিয়াহভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এটি শুধু একটি নতুন ব্যাংকের জন্ম নয়, বরং দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল সুশাসন এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকিং খাতকে পুনর্গঠনের একটি কঠিন পরীক্ষাও বটে।
এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক—এই পাঁচটি ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি বছরের পর বছর ধরে দুর্বল হয়েছে। অনিয়মিত ঋণ বিতরণ, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন, দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং নজরদারির ব্যর্থতায় অনেক ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের হার ৯০ শতাংশেরও বেশি পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে একীভূতকরণ অনেকটাই অনিবার্যই ছিল, যদিও এক্সিম ব্যাংককে এখানে ঢুকানো নিয়ে প্রশ্ন আছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তি হিসাবের গ্রাহকদের মূল আমানতের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া আজ শুরু হলেও টাকা পাওয়া যাবে আগামী ৭ সেপ্টেম্বর থেকে। প্রাথমিকভাবে গ্রাহকেরা তাঁদের হিসাব থেকে জমানো সম্পূর্ণ মূল অর্থ এককালীন তুলতে বা নগদায়ন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কোনো মুনাফা পাবেন না তাঁরা। এজন্য আজ মঙ্গলবার থেকে আবেদন গ্রহণ করবে ব্যাংকটির শাখাগুলো।
শাখা ও উপশাখাগুলোতে নগদ টাকার রিকুইজিশন পাঠানো, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নগদ টাকার জোগান নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিমুক্ত ক্যাশ ব্যবস্থাপনাসহ সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে কয়েক দিন সময় প্রয়োজন। সে জন্যই ৭ সেপ্টেম্বর থেকে পুরোদমে আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যাংকের চলতি হিসাব, সঞ্চয়ী এবং বিভিন্ন মেয়াদি হিসাব থেকে গ্রাহকেরা তাঁদের জমানো মূল টাকা তুলে নিতে পারবেন। তবে যেসব গ্রাহক হিসাব বন্ধ না করে চালু রাখবেন, তাঁরা চুক্তি অনুযায়ী পূর্বনির্ধারিত হারে যথারীতি মুনাফা পেতে থাকবেন। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রম পূর্ণমাত্রায় চালু হলে মুনাফাসহ যেকোনো পরিমাণ অর্থ জমা ও উত্তোলনের সুযোগ মিলবে।
টাকা পরিশোধ শুরু হওয়ার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া আস্থা ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছে নতুন ব্যাংকের কর্তৃপক্ষ। তবে সবকিছু নির্ভর করবে গ্রাহক সেবার ওপর।
পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা আছে। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীর সঞ্চয়ী হিসাবে রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। পাঁচ ব্যাংকের মোট ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা ঋণের ৮৬ শতাংশ এখন খেলাপি। আর মূলধন ঘাটতি রয়েছে দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি।
সরকারি মালিকানার ব্যাংক হিসেবে গত বছরের নভেম্বরে যাত্রা শুরু করা ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার দেওয়া হবে।
এদিকে একীভূত হওয়া পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক নিয়ে গঠিত 'সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক'-এর জন্য কৌশলগত বিদেশি অংশীদার (স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার) খুঁজছে সরকার, যারা মালিকানায় যুক্ত হয়ে নতুন বিনিয়োগ করে ব্যাংকটিকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। প্রথম প্রস্তাব গেছে কাতারে। কাতার ছাড়াও সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে কৌশলগত অংশীদার খোঁজা হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো—চালুর পরপরই জমানো টাকা প্রত্যাহারের যে চাপ শুরু হবে, সম্মিলিত ব্যাংকের ওপর সম্মিলিত এই গ্রাহক চাপ সামলাবে কী করে? এটি একটা বড় চাপ, আছে ভাবমূর্তির সংকট, আছে অসংখ্য ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জ। এতসব কিছুর পরও নতুন ব্যাংকের জন্য শুভকামনা থাকল ঢাকা জার্নালের পক্ষ থেকে।
Comments