মক্কা চুক্তি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি: নতুন নিরাপত্তা জোটে কি যোগ দেবে ঢাকা?
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত 'মক্কা চুক্তি'-তে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ বিবেচনা করতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন এক মন্ত্রী। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি দেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে।
চলতি মাসে সৌদি আরবের পবিত্র শহর মক্কায় সুন্নি মুসলিমপ্রধান এই তিনটি দেশের মধ্যে সামরিক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি এই চুক্তির মূল কথা হলো—কোনো সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশকে এই চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার জন্য সৌদি আরব আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী দেশগুলোর মধ্যে এ ধরনের কোনো নিরাপত্তা জোটে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং তা বিবেচনা করা হতে পারে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কোনো সামরিক জোটে বাংলাদেশ যোগ দিলে তা দেশের ঐতিহ্যগত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রধানত তৈরি পোশাক রপ্তানি (যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ ও যুক্তরাজ্য) এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) ওপর নির্ভরশীল। কোনো জোটে জড়ালে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এর প্রভাব পড়তে পারে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়ার মতে, এই জোটে যোগ দিলে কেবল ভারতের সঙ্গেই নয়; বরং চীন, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সমীকরণ জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ শাহান মনে করেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে কেবল অন্য দেশ কী ভাববে, তার ওপর ভিত্তি করে দেশের নীতি নির্ধারণ করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সংবেদনশীল সময় পার হচ্ছে। সীমান্তে জোর করে মানুষ ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি এবং সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে তাঁর বক্তব্য ঘিরে ঢাকার অসন্তোষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে।
এমন এক সময়ে পাকিস্তানের মতো দেশের সঙ্গে গঠিত কোনো সামরিক নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশ যোগ দিলে নয়াদিল্লি তা ভালোভাবে নাও নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তবে সামগ্রিক কৌশলগত ও অর্থনৈতিক ফলাফল বিবেচনা করেই বাংলাদেশকে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
Comments