তাহলে কি একীভূতকরণই ভুল ছিল?
পাঁচটি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের নতুন সিদ্ধান্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—সমস্যা কি আসলে ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণে ছিল, নাকি ছিল একীভূতকরণ বাস্তবায়নের পদ্ধতিতে?
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তি আমানতকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী মূল টাকা তুলতে পারবেন এবং ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মুনাফায় কোনো 'হেয়ারকাট' থাকছে না। এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে গ্রাহকদের জন্য স্বস্তির। কিন্তু একই সঙ্গে এটি আগের নীতির যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। যদি শেষ পর্যন্ত আমানতকারীদের মূল অর্থ ও মুনাফা কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতেই হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—আগের সিদ্ধান্তটি কি প্রয়োজনীয় ছিল, নাকি সংকট ব্যবস্থাপনায় নীতিগত ও প্রক্রিয়াগত ভুল হয়েছিল?
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। কোনো ব্যাংককে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিজেই ভুল, এমন সিদ্ধান্ত শুধু 'হেয়ারকাট' প্রত্যাহারের ভিত্তিতে পৌঁছানো যায় না। দুর্বল ব্যাংককে শক্তিশালী কাঠামোর মধ্যে আনা, আমানতকারীদের সুরক্ষা দেওয়া এবং পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য একীভূতকরণ কখনো কখনো প্রয়োজনীয় হতে পারে। প্রশ্ন হলো, সেই একীভূতকরণ কোন প্রক্রিয়ায়, কোন মূল্যায়নের ভিত্তিতে এবং কার দায় নির্ধারণ করে করা হয়েছে।
পাঁচটি ব্যাংকের বিপুল অনিয়ম, খেলাপি ঋণ ও আর্থিক দুর্বলতার দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলে সেটিই বড় উদ্বেগের জায়গা। কারণ রাষ্ট্রীয় অর্থ মানে শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থ। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, অনিয়মে জড়িত ঋণগ্রহীতা এবং তদারকিতে ব্যর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণ না করে শুধু আমানতকারীদের বিপদে ফেলা হলে সেটি ন্যায়সংগত সংস্কার হতে পারে না।
ব্যাংক উদ্ধারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবেও একটি মৌলিক নীতি হলো—প্রথমে দায়ীদের শনাক্ত করা, সম্পদ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা এবং ক্ষতির বোঝা যথাসম্ভব দায়ীদের ওপর দেওয়া। আমানতকারীদের সুরক্ষা দেওয়া হবে, কিন্তু যারা ব্যাংককে দুর্বল করেছে তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হবে না—এই ভারসাম্যই হওয়া উচিত।
এখানেই 'হেয়ারকাট' বিতর্কের গুরুত্ব। আমানতকারীর টাকা কেটে ব্যাংকের হিসাব মেলানো তুলনামূলক সহজ পথ হতে পারে, কিন্তু এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থায় বড় আঘাত করতে পারে। একজন সাধারণ মানুষ যদি মনে করেন ব্যাংকে রাখা তার বৈধ আমানতও নীতিগত সিদ্ধান্তে কেটে নেওয়া হতে পারে, তাহলে ব্যাংকের প্রতি তার আস্থা কমবে—এটাই স্বাভাবিক।
একই প্রশ্ন উঠে আসে একীভূতকরণের আওতায় কোন ব্যাংকগুলোকে আনা হলো, আর কোনগুলো বাইরে থাকল—তা নিয়েও। যদি একই ধরনের বা আরও দুর্বল আর্থিক অবস্থায় থাকা অন্য ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে ভিন্ন নীতি নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেই নির্বাচনের যুক্তি জনসমক্ষে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ব্যাংক একীভূতকরণ ব্যক্তিগত পছন্দ, সম্পর্ক বা দ্বন্দ্বের ভিত্তিতে নয়; আর্থিক তথ্য, ঝুঁকি, আমানতকারীর স্বার্থ এবং সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
সুতরাং আজকের বাস্তবতা থেকে সরাসরি বলা যায় না যে 'একীভূতকরণই ভুল ছিল।' বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—একীভূতকরণের প্রক্রিয়াটি কি যথাযথ ছিল?
কোন ব্যাংক কেন একীভূত হলো, তাদের প্রকৃত সম্পদ ও দায় কত ছিল, মূল্যায়ন কীভাবে করা হলো, কারা সিদ্ধান্ত নিল, ক্ষতির দায় কে নেবে এবং অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর প্রয়োজন।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের স্বস্তি অবশ্যই ইতিবাচক খবর। কিন্তু এই স্বস্তি যেন শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ না থাকে। এর সঙ্গে ব্যাংক খাতের পুরোনো অনিয়মের দায় নির্ধারণ, সম্পদ পুনরুদ্ধার, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকির ব্যর্থতার জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ ব্যাংক একীভূত করে একটি নতুন প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া সহজ। কঠিন কাজ হলো—পুরোনো অনিয়মের দায় কার, সেই প্রশ্নের ন্যায়সংগত উত্তর দেওয়া।
আজকে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই একীভূতকরণ ঠিক না ভুল—শুধু সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, একীভূতকরণের নামে কি রাষ্ট্র ও সাধারণ আমানতকারীর ওপর পুরোনো অনিয়মের দায় চাপানো হয়েছে? যদি হয়ে থাকে, তাহলে সমস্যা একীভূতকরণে যতটা, তার চেয়ে বেশি সমস্যা ছিল প্রক্রিয়ায়, ন্যায়যুতায় এবং জবাবদিহির ঘাটতিতে।
Comments