সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক: ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই, সামনে কঠিন পরীক্ষা
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে পাঁচটি দুর্বল শরিয়াহভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন একটি নজিরবিহীন ঘটনা। এটি শুধু একটি নতুন ব্যাংকের জন্ম নয়, বরং দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল সুশাসন এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকিং খাতকে পুনর্গঠনের একটি কঠিন পরীক্ষাও বটে। প্রশ্ন হলো—এই উদ্যোগ কি সত্যিই সফল হবে, নাকি এটি কেবল সংকটকে সাময়িকভাবে আড়াল করার একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ হয়ে থাকবে?
এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক—এই পাঁচটি ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি বছরের পর বছর ধরে দুর্বল হয়েছে। অনিয়মিত ঋণ বিতরণ, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন, দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং নজরদারির ব্যর্থতায় অনেক ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের হার ৯০ শতাংশেরও বেশি পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে একীভূতকরণ ছিল অনেকটাই অনিবার্য।
ইতিমধ্যেই নতুন ব্যাংকটি ধীরে ধীরে কার্যক্রম স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। গ্রাহকরা সীমিত পরিসরে আমানত উত্তোলন করতে পারছেন। এলসির মাধ্যমে ট্রেড ফাইন্যান্স শুরু হয়েছে, নতুন আমানত সংগ্রহ চলছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তাও কার্যক্রম সচল রাখতে ভূমিকা রাখছে। তবে বাস্তবতা হলো, পাঁচটি ব্যাংক এখনও নিজেদের পুরোনো কাঠামো অনুযায়ী অনেক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শুধু সাইনবোর্ডে নতুন নাম এসেছে, কিন্তু ভেতরের পূর্ণাঙ্গ একীভূতকরণ এখনো অনেক দূরের পথ।
এই দীর্ঘ সময়ের পেছনে বাস্তব কারণও রয়েছে। পাঁচটি ব্যাংকের বিপুল জনবল, শত শত শাখা, ভিন্ন ভিন্ন কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার, পৃথক গ্রাহক তথ্যভাণ্ডার এবং আলাদা হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা এক প্ল্যাটফর্মে আনতে সময় লাগবে। ব্যাংকারদের ধারণা, পুরো একীভূতকরণ সম্পন্ন হতে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এর মধ্যে একটি অনিশ্চয়তাও রয়ে গেছে। মুনাফার ওপর 'হেয়ার কাট' বাতিলের বিষয়ে ব্যাংকাররা মৌখিক আশ্বাস পেলেও এখনো কোনো লিখিত নির্দেশনা পাননি। ফলে নীতিগত স্পষ্টতার অভাব কিছুটা হলেও বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
তবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা প্রযুক্তিগত নয়, আর্থিকও নয়—এটি আস্থার পরীক্ষা। একটি ব্যাংকের মূল সম্পদ তার ভবন বা শাখা নয়; সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো আমানতকারীর বিশ্বাস। যেদিন মানুষ নিশ্চিত হবে যে প্রয়োজনের সময় তারা তাদের অর্থ নির্বিঘ্নে তুলতে পারবেন, সেদিনই প্রকৃত অর্থে এই ব্যাংকের পুনর্জন্ম ঘটবে।
এখানে আরেকটি বাস্তবতা রয়েছে। দেশের ব্যাংকিং খাতে আগে থেকেই শক্ত অবস্থানে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। সুপ্রতিষ্ঠিত, বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘদিনের বাজার আস্থার কারণে নতুন ব্যাংকটির জন্য প্রতিযোগিতা সহজ হবে না। তাই শুধু রাষ্ট্রীয় সহায়তার ওপর নির্ভর করে নয়, দক্ষ সেবা ও সুশাসনের মাধ্যমেই বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে হবে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলে, সংকটাপন্ন ব্যাংক একীভূত করা নতুন কোনো বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ আর্থিক সংকটের সময়ে এই পথ অনুসরণ করেছে। কিন্তু একটি বিষয় সব ক্ষেত্রেই স্পষ্ট—মার্জার কখনোই একক সমাধান নয়। এটি তখনই সফল হয়, যখন এর সঙ্গে কঠোর নিয়ন্ত্রক সংস্কার, দায়ীদের জবাবদিহি এবং আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা যায়।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও জটিল। এখানে শুধু খেলাপি ঋণের সমস্যা নয়; অর্থ পাচার, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতা সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে কেবল পাঁচটি ব্যাংককে একত্র করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
নতুন ব্যাংকের সামনে অন্তত চারটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ উদ্ধার। বিশেষ করে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া। দ্বিতীয়ত, পর্যাপ্ত মূলধন নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, পাঁচটি পৃথক প্রযুক্তি ও পরিচালন কাঠামোকে একীভূত করা। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা।
একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তারা চান স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ, চাকরির নিরাপত্তা এবং পেশাদার পরিবেশে কাজ করার সুযোগ। এই প্রত্যাশা পূরণ না হলে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাও ব্যাহত হতে পারে।
সবশেষে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে কেবল পাঁচটি ব্যাংকের নতুন পরিচয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত সংস্কারের সক্ষমতার একটি লিটমাস পরীক্ষা। যদি লুট হওয়া অর্থ উদ্ধার করা যায়, খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়, পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাজনৈতিক প্রভাব থেকে ব্যাংককে মুক্ত রাখা যায়, তবে এই উদ্যোগ একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে। কিন্তু অতীতের ভুল যদি আবার ফিরে আসে, তাহলে শুধু একটি ব্যাংক নয়—রাষ্ট্র, করদাতা এবং পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকেই তার মূল্য দিতে হবে।
অতএব, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সফলতা নির্ভর করবে নতুন লোগো, নতুন সাইনবোর্ড বা প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ওপর নয়; বরং আস্থা পুনর্গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বাস্তব সক্ষমতার ওপর। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে লাভবান হবে শুধু একটি ব্যাংক নয়, গোটা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত।
Comments