আবু সাঈদের রক্তে গতিপথ পাল্টে যায় আন্দোলনের
দুই বছর পার হয়ে আবারও ফিরেছে ১৬ জুলাই। আজ 'জুলাই শহীদ দিবস'।
২০২৪ সালের এই দিনে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার ঘটনায় কোটা সংস্কার আন্দোলন নতুন মোড় নিয়েছিল। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আন্দোলন এক দফায় রূপ নেয়। ৩৬ দিনের সেই আন্দোলনে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়।
আবু সাঈদের পাশাপাশি একই দিন চট্টগ্রামে শহীদ হন চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ও কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ওয়াসিম আকরাম।
বৈষম্যবিরোধী এ আন্দোলনে প্রথমবারের মতো এক দিনে প্রাণ হারান ছয় সূর্যসন্তান। পরে দিনটিকে সরকার 'জুলাই শহীদ দিবস' হিসেবে ঘোষণা করে। এ উপলক্ষে আজ রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক দিবস পালন করা হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাণী দিয়েছেন।
আজ দেশের সব সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব সরকারি ও বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। এ ছাড়া জুলাই শহীদদের রুহের মাগফিরাতের জন্য সব মসজিদে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে তাঁদের আত্মার শান্তির জন্য বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে। দিবসের কর্মসূচির মধ্যে আজ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন কক্সবাজারের পেকুয়ায় শহীদ ওয়াসিমের বাড়িতে গিয়ে সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং চট্টগ্রামের মুরাদপুরে শহীদ ওয়াসিমের শাহাদাতস্থলে একটি স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।
জানা যায়, শিক্ষার্থীদের সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন যখন চলছিল, ঠিক তখনই তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আন্দোলন দমাতে ছাত্রদের ওপর নির্বিচার গুলি চালায়। ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আবু সাঈদ পুলিশের বন্দুকের সামনে যেভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায় পুরো বিশ্ব। তাঁর মৃত্যুতে পাল্টে যায় আন্দোলনের গতিপথ। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও তাদের সমর্থকদের হামলায় ১৬ জুলাই আবু সাঈদ, ওয়াসিমের পাশাপাশি সারা দেশে শহীদ হন ছয়জন। আন্দোলনে শহীদ অন্য চারজনের মধ্যে দুজন ঢাকার এবং বাকিরা চট্টগ্রামের। ঢাকায় শহীদ হন নিউমার্কেট এলাকার হকার মো. শাহজাহান এবং নীলফামারীর যুবক সবুজ আলী। চট্টগ্রামে এমইএস কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমদ শান্ত এবং স্থানীয় ফার্নিচার দোকানের কর্মচারী মোহাম্মদ ফারুক। আহত হয় অসংখ্য ছাত্র-জনতা। জেলায় জেলায় সংঘর্ষ, বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। একদিকে সমগ্র দেশের ছাত্র-জনতা, অন্যদিকে আওয়ামী সরকার, তাদের সমর্থক গোষ্ঠী ও প্রশাসন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও এ দিন আন্দোলনে যোগ দেয়। অবস্থা বেগতিক দেখে এবং আন্দোলন দমাতে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে হাসিনা সরকার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সারা দেশে মোতায়েন করে সব ধরনের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। কিন্তু সরকারের এ দমনপীড়ন ঠেকাতে পারেনি আন্দোলনকারীদের। সারা দেশে একে একে আওয়ামী লীগের অফিসে আগুন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্রলীগকে বের করে দেন আন্দোলনকারীরা। কেঁপে ওঠে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী মসনদ। পরে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপ নেয় ছাত্র-জনতার সম্মিলিত এক দফা আন্দোলনে—স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট সরকারের পদত্যাগ। সরকার পতনের আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ৫ আগস্ট ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তাঁদের স্বপ্নের বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনে দল-মত-পথ-নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহবান জানিয়েছেন। বাণীতে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে দিনটি এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দিন। তিনি ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী সব বীর শহীদের অসামান্য অবদান গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের বৈষম্য, দুর্নীতি, গুম-খুন, ভোটাধিকার হরণ, নিপীড়ন ও ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের জনগণের ক্ষোভের বিস্ফোরণ। রাষ্ট্রপতি বলেন, এই গণ-অভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক আন্দোলন বা অর্জন নয়; এটি ছিল গণতন্ত্রকামী মানুষের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা, সাহস ও আত্মত্যাগের ফসল।
এদিকে 'জুলাই শহীদ দিবস' উপলক্ষে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এই বাণী দেন। এ সময় তিনি দেশের সর্বক্ষেত্রে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমি মহান আল্লাহর দরবারে শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরামসহ ১৬ জুলাইয়ের সব শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।' তিনি বলেন, 'জুলাইয়ের সেই গণ-অভ্যুত্থান শুধু একটি আন্দোলনই ছিল না, এটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশক ধরে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ফ্যাসিবাদ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, লুণ্ঠন, গুম, খুন, দমন-পীড়ন এবং ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে সমগ্র জাতির ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ। সেই আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের শক্তিতেই বাংলাদেশের মানুষ তাদের মর্যাদা, অধিকার এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে নতুন করে প্রতিষ্ঠার সুযোগ লাভ করেছে। ঐতিহাসিক সেই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পর আজ আমাদের সরকার শহীদদের পবিত্র আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।'
আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এরই মধ্যে রায় দিয়েছেন। ওই আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা-নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের করা পৃথক মামলা হয়েছিল আট মাস পর। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন রেজিস্ট্রার ড. হারুন-অর-রশীদ বাদী হয়ে মামলাটি করেছিলেন। মামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক, একাধিক কর্মচারী, আটজন পুলিশ সদস্য, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ ৭১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এখনো আদালতে অভিযোগপত্র জমা পড়েনি। পুলিশ বলছে, তারা 'রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের' অপেক্ষায় রয়েছে।
Comments