খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জে বন্যা: ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি
কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে গেছে। এতে হবিগঞ্জ জেলার তিনটি উপজেলার চার ইউনিয়নের অন্তত ৩০ হাজার মানুষ আকস্মিক বন্যার কবলে পড়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ঘরবাড়িতে পানি উঠে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যায় সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় নদী রক্ষা বাঁধটি ভেঙে যায়।
বাঁধভাঙা পানি তীব্র গতিতে লোকালয়ে প্রবেশ করে সদর উপজেলার লস্করপুর ও পইল ইউনিয়ন, বাহুবলের লামাতাসি এবং বানিয়াচং উপজেলার মকরমপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ গ্রাম প্লাবিত করেছে। বহু পরিবার তাদের গবাদিপশু, আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে নিরাপদ স্থানে ছুটে চলেছেন।
এদিকে, বানিয়াচং উপজেলার রাধাপুর বাঁধ উপচে পানি দ্রুত হাওর এলাকায় প্রবেশ করছে। অন্যদিকে চুনারুঘাট উপজেলার নালমুখ বাজার এলাকায় নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করায় হরিজন সম্প্রদায়ের রবিদাস পাড়ার অন্তত ১৫টি পরিবার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনাও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার মুখে পড়েছে।
খোয়াই নদীর মাছুলিয়া পয়েন্টের শহর রক্ষা বাঁধটিও বর্তমানে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। বাঁধটি টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় বাসিন্দারা দিনরাত স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করে যাচ্ছেন। সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকাতে তারা বাঁশ ও বালুর বস্তা ব্যবহার করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ—পানি উন্নয়ন বোর্ডের চরম অবহেলা এবং সময়মতো টেকসই সংস্কার ব্যবস্থা না নেওয়ায় এই মুহূর্তে পুরো শহর ঝুঁকিতে পড়েছে।
ইতিমধ্যে হবিগঞ্জ শহরের কামড়াপুর ও রিচি এলাকাসহ কিছু নিচু অংশে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। দুর্গত মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি, স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্র এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিচ্ছেন।
বন্যার পানি হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বেশ কয়েকটি পয়েন্টে উঠে গেছে। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রশাসন আশঙ্কা করছে, পানির স্তর এভাবে বাড়তে থাকলে হবিগঞ্জ সদরের সঙ্গে মিরপুর ও আশপাশের এলাকার সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, খোয়াই নদীর পানি চুনারুঘাটের বাল্লা পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৯২ সেন্টিমিটার, শায়েস্তাগঞ্জ পয়েন্টে ১১৩ সেন্টিমিটার এবং মাছুলিয়া পয়েন্টে ১৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া কুশিয়ারা নদীর কিছু পয়েন্টেও পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (কন্ট্রোল রুম) খোলা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মাইনুল হক এবং সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল্লাহ-আল-মামুন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
সদর ইউএনও জানান, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় উদ্ধার অভিযান ও ত্রাণ বিতরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জরুরি সহায়তার জন্য বর্তমানে ৫ লাখ টাকা, ১০০ টন চাল এবং ১ হাজার ৮২০ প্যাকেট শুকনা খাবার মজুত রাখা হয়েছে।
Comments