পাঁচ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন চূড়ান্ত, ৪টিকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ
নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও চরম তারল্য সংকটে জর্জরিত পাঁচটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) চূড়ান্তভাবে বন্ধ বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সাথে তুলনামূলক কম সংকটে থাকা আরও চারটি প্রতিষ্ঠানকে শর্তসাপেক্ষে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য তিন মাসের সময় দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এক বোর্ড সভায় আর্থিক সক্ষমতা প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর 'ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬'-এর আওতায় এই ঐতিহাসিক ও সাহসী পদক্ষেপ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ভয়াবহ খেলাপি ঋণ এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় নিচের ৫টি প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের চিত্র প্রায় শতভাগ। এফএএস (FAS) ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণ ৯৯.৯৯ শতাংশ, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের খেলাপি ঋণ ৯৯.৪৪ শতাংশ, পিপলস লিজিংয়ের খেলাপি ঋণ প্রায় ৯৫ শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণ ৯৮.৫০ শতাংশ, আভিভা ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণ ৯৩.৯৩ শতাংশ।
আভিভা ফাইন্যান্সের দায়িত্বে ছিলেন চট্টগ্রামের বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম (সাইফুল আলম)। বাকি চারটির নিয়ন্ত্রণে ছিলেন বহুল আলোচিত পি কে হালদার। এদের আমলে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করায় প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি দেউলিয়া হয়ে পড়ে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, অবসায়নে যাওয়া ৫টি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৭ হাজার আমানতকারীর ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা জমা রয়েছে। আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। গ্রাহকদের টাকা মেটাতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ তহবিল বরাদ্দ দেবে। প্রশাসক নিয়োগের পর প্রথম ধাপে ব্যক্তিগত আমানতকারীরা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন।
টাকা ফেরতের আগে স্বনামধন্য অডিট ফার্ম দিয়ে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ফরেনসিক অডিট করা হবে। আর্থিক অনিয়মে জড়িত দায়ীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
যে ৪টি প্রতিষ্ঠানকে 'ব্যাংক রেজল্যুশন আইন'-এর ১৫ ধারা অনুযায়ী অকার্যকর অবস্থা থেকে পুনরায় সচল (ভায়াবল) হওয়ার শেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো: প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড
এই ৪টি প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে হলে তাদের পর্ষদকে ৩ মাসের মধ্যে নিচের শর্তগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে। স্পনসর শেয়ারহোল্ডারদের নিজেদের পকেট থেকে নতুন মূলধন জোগান দিতে হবে। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সম্পদ ও সম্পত্তি বিক্রি করে তারল্য সংকট কাটাতে হবে। বকেয়া ও খেলাপি ঋণ আদায়ে জোরালো ভূমিকা নিতে হবে। প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে অগ্রগতির প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেজল্যুশন বিভাগে জমা দিতে হবে।
নির্ধারিত ৩ মাসের মধ্যে যেকোনো একটি শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে অবিলম্বে অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
উচ্চ খেলাপি ঋণ ও গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে না পারায় গত বছরের মে মাসে ২০টি এনবিএফআই-কে বন্ধের নোটিশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে যে ৯টি প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা সন্তোষজনক ছিল না, সেগুলোর বিরুদ্ধেই বর্তমান এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে আর্থিক খাতের প্রতি আমানতকারীদের হারানো আস্থা আবার ফিরে আসবে।
Comments