আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল কি পুনর্বিবেচনা করছে সরকার?
জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে আদ্-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অক্সিজেন স্বল্পতা ও চরম অবহেলার কারণে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স বাতিল করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ থাকার পর এখন সেই কঠোর সিদ্ধান্তটি নতুন করে পুনর্বিবেচনা করার কথা ভাবছে সরকার। লাইসেন্স বাতিলের আদেশ প্রত্যাহারের জন্য আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষের করা এক আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালটিকে তাদের অভ্যন্তরীণ ত্রুটি ও চিকিৎসাসেবার মান সংশোধনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু সময় দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে, ঘটনার পর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদ (গভর্নিং বডি) পরিবর্তন করার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সরকার। তবে লাইসেন্স ফেরত পেতে হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কয়েকটি কঠোর শর্ত পূরণ করতে হবে: ১. ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ প্রদান করা। ২. ঘটনার জন্য দায়ী বা অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ৩. হাসপাতালের সব ধরনের প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত ত্রুটি সংশোধনের লিখিত প্রতিশ্রুতি দেওয়া।
এই বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ''আইনগতভাবে বিবেচনা করার সুযোগ থাকলে মন্ত্রণালয় তা করতে পারে। তবে এটি এখন প্রক্রিয়াধীন।''
ছয় শিশুর মৃত্যুর পর আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধের বিপক্ষে সামাজিক মাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে নানামুখী আলোচনা চলছে। বিশেষ করে এই হাসপাতালে কম খরচে প্রান্তিক মানুষের ডায়ালাইসিসসহ অন্যান্য সেবা পাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। গতকাল রবিবার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদেও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের ব্যাখ্যা দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদে বলেন, ''অনেকেই বলেছেন, সেখানে ২০০-২৫০ টাকায় ডায়ালাইসিস হয়, সেটা সত্য। কিন্তু মাথা ব্যথা হলে যেমন মাথা কেটে ফেলা যায় না, তেমনই যারা ভুল করেছেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতেই হবে। আমরা মূলত লাইসেন্স স্থগিত করেছি, হাসপাতাল চিরতরে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিইনি। স্বাস্থ্যসেবায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।'' (যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এটিকে লাইসেন্স 'বাতিল' হিসেবে উল্লেখ করেছে)।
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তারিকুল ইসলাম মুকুল জানান, "স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যেসব ত্রুটির কথা বলা হয়েছিল, আমরা সেগুলো সংশোধন করে ইতিমধ্যে সচিব বরাবর আবেদন করেছি। আমরা এখন সরকারের ইতিবাচক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।"
এদিকে হাসপাতাল বন্ধ থাকায় আদ্-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজে অধ্যয়নরত বিদেশি শিক্ষার্থীরা মারাত্মক একাডেমিক সংকটে পড়েছেন। কলেজ চালু থাকলেও ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারত ও মালদ্বীপের ২৯৫ জন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কসহ আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, যে প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি সম্পন্ন করেন, ইন্টার্নশিপও সেই হাসপাতালেই করতে হয়। হাসপাতাল বন্ধ থাকার কারণে তাঁদের অন্য কোথাও স্থানান্তর করা হলে নিজ দেশের মেডিক্যাল কাউন্সিলের জটিলতায় তাঁদের পুরো শিক্ষাজীবন ভেস্তে যেতে পারে। এই সংকটের প্রতিকার চেয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন।
Comments