সঞ্চয়পত্রে করের কাঁচি
বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে কথা উঠলেই সাধারণত ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি সহায়তা কিংবা ভাতা কর্মসূচির প্রসঙ্গ সামনে আসে। কিন্তু এমন একটি শ্রেণি আছে যারা কোনো ভাতার তালিকায় নেই, আবার ধনীর কাতারেও পড়ে না। অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী, প্রবাসী পরিবারের সদস্য, গৃহিণী কিংবা আজীবন সঞ্চয় করে রাখা মধ্যবিত্ত মানুষদের কাছে সঞ্চয়পত্রই ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা বেষ্টনী। অথচ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব সেই নিরাপত্তা বেষ্টনীতেই নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সরকারের যুক্তি হলো,এটি চূড়ান্ত কর নয়;বরং অগ্রিম কর। বছর শেষে কারও প্রকৃত কর দায় এর চেয়ে কম হলে অতিরিক্ত অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে। কাগজে-কলমে এই যুক্তি যথার্থ মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতার প্রশ্ন হলো-বাংলাদেশের কতজন ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারী নিয়মিত কর রিটার্ন দাখিল করে, কর সমন্বয়ের আবেদন করে এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অতিরিক্ত কাটা টাকা ফেরত নিতে পারবেন?
ধরা যাক,একজন নারীর ৪৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র রয়েছে। সেখান থেকে বছরে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা মুনাফা আসে। নতুন ব্যবস্থায় মুনাফার ১০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম কর হিসেবে কেটে নেওয়া হবে। কিন্তু করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা হওয়ায় তার প্রকৃত করযোগ্য আয় মাত্র ৭৫ হাজার টাকা। বর্তমান করহার অনুযায়ী তার কর দায় ২৫ হাজার টাকারও কম হতে পারে। যদি তার একজন প্রতিবন্ধী সন্তান থাকে,তাহলে অতিরিক্ত করমুক্ত সুবিধা পাওয়ার কারণে করযোগ্য আয় শূন্যেও নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ যাঁর কোনো কর দেওয়ার কথা নয়, তাঁর কাছ থেকেও সরকার আগেভাগে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে রাখছে।
এখানেই মূল প্রশ্ন। কর আদায়ের উদ্দেশ্য যদি রাজস্ব বৃদ্ধি হয়,তাহলে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর ঘোষণার বাস্তব সুফল কোথায়? কারণ অনেক সঞ্চয়কারীর ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত কাটা অগ্রিম কর ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া এতটাই জটিল যে সেটি কার্যত এক ধরনের চূড়ান্ত করেই পরিণত হয়। ফলে আয়সীমা বৃদ্ধির সুবিধা কাগজে থাকলেও বাস্তবে তা অনেকের কাছে পৌঁছায় না।
সরকার একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর কমিয়ে জনবান্ধব বাজেটের কথা বলছে, অন্যদিকে মধ্যবিত্তের সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যমের মুনাফা থেকে দ্বিগুণ হারে কর কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে। কারণ যে মানুষটি সারা জীবন সঞ্চয় করে পাঁচ বা দশ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছেন,তিনি কোনো বিত্তশালী বিনিয়োগকারী নন। বরং তিনি রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাইরে থাকা একজন সাধারণ নাগরিক, যিনি নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেই নিয়েছেন।
আরও একটি বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। ব্যাংকিং খাতে এখনো অনেক মানুষের আস্থার সংকট রয়েছে। সুদের হার তুলনামূলক কম,আর্থিক খাতের নানা অনিয়ম নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে সঞ্চয়পত্র এখনো ক্ষুদ্র ও মধ্যম সঞ্চয়কারীদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিনিয়োগ মাধ্যম। মুনাফার ওপর কর বাড়িয়ে এই খাতকে কম আকর্ষণীয় করা হলে মানুষ কোথায় যাবে? ব্যাংকে, নাকি অনানুষ্ঠানিক ও ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের দিকে? রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিতে এই প্রশ্নের উত্তর থাকা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,সঞ্চয়পত্রকে কেবল বিনিয়োগ হিসেবে দেখা যাবে না;এটি সামাজিক নিরাপত্তারও একটি উপকরণ। সরকার যখন বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জন্য আলাদা কার্ড ও ভাতা কর্মসূচি চালু করে, তখন সেই মানুষদের কথাও ভাবতে হবে যারা কোনো সরকারি সহায়তা পান না কিন্তু নিজেদের সীমিত সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন। তাদের কাছে পাঁচ বা দশ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রই এক ধরনের 'নিরাপত্তা কার্ড'।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় দুটি পদক্ষেপ গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা যেতে পারে। প্রথমত,দশ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে বা অগ্রিম কর সম্পূর্ণ শূন্য করা। দ্বিতীয়ত,দশ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করা। এতে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা উৎসাহিত হবেন,আর সরকারের রাজস্ব ক্ষতিও তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকবে।
একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল কর আদায় করা নয়;বরং করনীতির মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও। সঞ্চয়পত্রের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে সেই লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন। তাই বাজেট পাসের আগে সরকারের উচিত এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা। কারণ মধ্যবিত্তের শেষ নিরাপদ আশ্রয়টুকু দুর্বল হলে তার অভিঘাত শুধু ব্যক্তিগত আর্থিক নিরাপত্তায় নয়,সামগ্রিক সঞ্চয় সংস্কৃতির ওপরও পড়বে।
Comments