এখনই অবসর নয় , জনগণের শক্তিতেই দেশে ফেরার ঘোষণা শেখ হাসিনার
ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর রাজনীতি থেকে অবসরের কথা ভাবলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে নিজের দেশের মানুষের পাশে থাকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। একই সাথে জনগণের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে খুব দ্রুত বাংলাদেশে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।
নয়াদিল্লি থেকে ভারতীয় গণমাধ্যম 'এই সময়'-কে দেওয়া একটি দীর্ঘ ও খোলামেলা একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। গণভবন ছেড়ে আসা, পদত্যাগ না করার কারণ থেকে শুরু করে বর্তমান সরকারের মূল্যায়ন এবং নিজের ও দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সবিস্তার কথা বলেছেন তিনি। আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) এই সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব প্রকাশিত হয়েছে।
'নেতা-কর্মীদের এই সংকটে আমি কীভাবে বিশ্রামে যাই?'
ভারতে আসার পর শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় মায়ের রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, সেই প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে শেখ হাসিনা একটি বিস্তারিত লিখিত উত্তর দেন। তিনি বলেন, "জয়ের বক্তব্য আমার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষ সারাজীবন একই দায়িত্বে থাকে না। আমিও বহুবার বলেছি নতুন নেতৃত্ব আসুক, তরুণেরা দায়িত্ব নিক। কিন্তু আজ বাংলাদেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। গণতন্ত্র আক্রান্ত, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বন্ধ করার আইন করা হয়েছে, আমার নেতা-কর্মীরা কারাগারে ও ঘরছাড়া। এমন একটা সময়ে আমি কীভাবে বলি যে আমি বিশ্রামে যাচ্ছি?"
তিনি আরও যোগ করেন, "আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে মানুষের দুঃসময়ে তাদের পাশে থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। ১৯৮১ সালে যখন সব হারিয়ে দেশে ফিরেছিলাম, তখন আওয়ামী লীগের কর্মীরাই ছিলেন আমার পরিবার। আজ তারা নির্যাতিত। আমি ক্ষমতা চাই না, কিন্তু জনগণের প্রতি আমার দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারি না। দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন ফিরিয়ে এনে এবং তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব নির্বাচনের পরেই আমি অবসর নেব।"
আওয়ামী লীগ কারও পারিবারিক সম্পত্তি নয়
দলের পরবর্তী নেতৃত্ব কার হাতে যাবে— এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে বলেন, "নেতৃত্ব কার হাতে যাবে, সেটি কোনো ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার নয়। আওয়ামী লীগ কারও পারিবারিক সম্পত্তি নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক দল। দলের কাউন্সিল (সম্মেলন)-এর মাধ্যমে, কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে এবং যোগ্যতা, ত্যাগ, সাহস ও আদর্শিক দৃঢ়তা দেখেই পরবর্তী নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে।"
দলে চলছে 'প্রাকৃতিক শুদ্ধকরণ'
দলের পদাধিকারী পরিবর্তন ও প্রবীণদের সরিয়ে তরুণদের দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, "দলীয় পুনর্গঠন ও নেতৃত্বের পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক ও অপরিহার্য প্রক্রিয়া। আমরা এই মুহূর্তে একটা প্রাকৃতিক শুদ্ধকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। যারা আদর্শের জন্য এই দলে ছিলেন, তারা আজকের দুর্দিনে আরও দৃঢ়ভাবে দলের পাশে আছেন। আর যারা ব্যক্তিগত সুবিধা ও ক্ষমতার আশায় ছিলেন, তারা ইতিমধ্যে ভোল পাল্টে ফেলেছেন বা চুপ করে গিয়েছেন। এটা দলকে দুর্বল করেনি, বরং খাঁটি করেছে।"
নেতৃত্বকে একটি 'পবিত্র দায়িত্ব' উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা কঠিন সময়ে কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে পারবেন না, তাদের বিষয়ে দলীয় কাঠামোর মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে প্রবীণ নেতাদের অবদান ও অভিজ্ঞতাকে দলের সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, আপাতত বড় কোনো রদবদল না হলেও দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরলে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মেধাবী ও দেশপ্রেমিক তরুণদের নেতৃত্বে আনা হবে।
'আজকের বিএনপি সরকারও আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারবে না'
বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দেশে ফেরা এবং রাজনীতি শুরু করা কতটা বাস্তবসম্মত— এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, "পাকিস্তানি শাসকরা পারেনি, সামরিক শাসকেরা পারেনি, খুনিরা পারেনি, ষড়যন্ত্রকারীরা পারেনি, আজকের বিএনপি সরকারও আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারবে না।"
নিজের প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, "আমার প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের সঙ্গে যুক্ত। দেশের জনগণ ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছেন যে আওয়ামী লীগই তাদের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। এই জনগণের শক্তিতে বলীয়ান হয়েই আমি মাথা উঁচু করে খুব দ্রুত বাংলাদেশের মাটিতে ফিরব।"
Comments