ভারতে জেন-জিদের ‘তেলাপোকা পার্টি’র হঠাৎ অভাবনীয় উত্থান!
ভারতের ঐতিহ্যগতভাবে আবেগীয় ও মেরুকৃত রাজনীতিতে অতি সম্প্রতি এক অদ্ভুত প্রতীকের আবির্ভাব ঘটেছে—'তেলাপোকা' (Cockroach)। অত্যন্ত ঘাতসহ ও ঘৃণিত বলে পরিচিত এই পতঙ্গটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি ভার্চুয়াল আন্দোলন মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে কোটি তরুণকে একই ছাতার নিচে নিয়ে এসেছে। 'ককরোচ জনতা পার্টি' বা সিজেপি (CJP) নামের এই আপাত-কৌতুকপূর্ণ মঞ্চটি এখন ভারতের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই অভূতপূর্ব ঘটনার পেছনে রয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তর একটি বিতর্কিত মন্তব্য। গত ১৫ মে আদালতে শুনানির সময় তিনি কর্মহীন যুবসমাজ এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্টদের পরোক্ষভাবে 'তেলাপোকা' ও 'পরজীবী' হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তীব্র সমালোচনার মুখে সুপ্রিম কোর্ট ব্যাখ্যা দেয় যে, মন্তব্যটি কেবল 'ভুয়া ডিগ্রিধারী' আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে ছিল। কিন্তু ততক্ষণে এই অবমাননাকর রূপকটি রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে উসকে দেয়। তরুণেরা এটিকে প্রতিরক্ষার ঢাল বানিয়ে বলতে শুরু করেন—'হ্যাঁ, আমরা তেলাপোকা। কারণ, সব প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা বেঁচে থাকি।'
বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে জনসংযোগ নিয়ে অধ্যয়নরত ৩০ বছর বয়সী ভারতীয় ছাত্র অভিজিৎ দিপক গত ১৬ মে এই সিজেপির যাত্রা শুরু করেন। দিপক এর আগে আম আদমি পার্টির (AAP) মিমভিত্তিক ডিজিটাল ক্যাম্পেইনের অন্যতম কারিগর ছিলেন।
সিজেপি নিজেকে কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দল দাবি করে না। তবে তাদের কৌতুকপূর্ণ ইশতেহারে লুকিয়ে আছে ৫টি কঠিন দাবি:
- প্রশাসনিক জবাবদিহি ও নির্বাচনী স্বচ্ছতা।
- গণমাধ্যম সংস্কার ও নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি।
- যোগ্যতা হিসেবে আবেদনকারীকে অলস, বেকার ও সার্বক্ষণিক অনলাইনে অ্যাক্টিভ থাকতে হবে।
সিজেপির উত্থানের গতিবেগ যেকোনো রাজনৈতিক প্রচারণাকে হার মানিয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহে সিজেপির ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার সংখ্যা ১ কোটি ৯০ লাখ ছাড়িয়েছে—যেখানে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির অফিশিয়াল ফলোয়ার মাত্র ৮.৭ মিলিয়ন।
এই ভার্চুয়াল ঝড় দেখে গত বৃহস্পতিবার ভারত সরকারের আইনি অনুরোধে সিজেপির ২ লাখের বেশি অনুসারী থাকা এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্টটি ভারতে ব্লক করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে, ক্ষমতাসীন দল এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনকে কতটা ভয়ের চোখে দেখছে।
ভারতের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই (প্রায় ৭০ কোটি) অনূর্ধ্ব-৩০ বছর বয়সী। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জনের পরও চাকরি না থাকা, সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য তরুণদের মূলধারার রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছে। সিজেপি এই বিশাল 'বিচ্ছিন্ন' যুবগোষ্ঠীকে মিম ও বিদ্রূপের ভাষা দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক আন্দোলন, নেপালের রাজনৈতিক রদবদল এবং বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, কর্মহীন ও ক্ষুব্ধ তরুণ প্রজন্ম কত দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ক্ষমতার তখত উল্টে দিতে পারে। ভারতে এখনো রাজপথ কাঁপানো বিপ্লব না দেখা গেলেও, সিজেপি সেই আগ্নেয়গিরির ভেতরের লাভার মতোই কাজ করছে।
ইতিহাস বলে, বিদ্রূপাত্মক রাজনীতি থেকে বড় শক্তির জন্ম হয়। ইতালিতে কৌতুক অভিনেতা বেপ্পে গ্রিলোর ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন পরে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল 'ফাইভ স্টার মুভমেন্টে' রূপ নেয়। ইউক্রেনের কমেডিয়ান ভলোদিমির জেলেনস্কি টিভি শোতে প্রেসিডেন্ট অভিনয় করতে করতেই বাস্তব জীবনের প্রেসিডেন্ট হন।
২০২৬ সালের এই মে মাসে এসে ভারতের রাজনীতিতে প্রথাগত স্লোগানের জায়গা নিয়েছে মিম। সিজেপি ট্রেন্ড হিসেবে হয়তো হারিয়ে যেতে পারে, তবে এটি ভারতের রাজনীতিতে গভীর যুব-বিচ্ছিন্নতার যে ক্ষতকে উন্মোচিত করেছে, তা সহজে নিরাময় হওয়ার নয়।
Comments