টিকা আটকে দিয়ে শিশুর মৃত্যু উন্মুক্ত করা হলো
এখন আর কোন সংশয় নেই, কোন লোকোনো ছাপানো নেই। দেশবাসী এখন পরিষ্কার বুঝতে পারছে যে, টিকায় শত শত শিশুর মৃত্যুর দায় অধ্যাপক ইউনূসের অন্তবর্তী সরকারের। এতদিন এ নিয়ে নানাভাবে সেই সরকারের দোষ আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু সব পরিষ্কার করে দিয়েছে জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ। বলতে গেলে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে প্রতিনিয়ত শিশু মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে টিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনার আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছেন ঢাকায় ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স। বুধবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বলেছেন,টিকার ঘাটতি নিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি পাঠিয়েছেন তারা এবং বৈঠক হয়েছে অন্তত ১০টি।
রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন,"আমার সামনে হয়ত সবগুলো তারিখ এখন নেই এবং আমার ধারণা, সেটা তদন্তে বেরিয়ে আসবে। তবে আমি জানি ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ কি ছয়টি চিঠি পাঠিয়েছি।
এতোদিন স্থানীয়ভাবে আভিযোগ আসছিল,ইউনিসেফের বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক পর্যায়েই এটি এখন সর্বজনস্বীকৃত অভিমত যে,বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতি-আকাঙ্ক্ষা ও দায়িত্বহীন অমানবিক গাফিলতির কারণেই বাংলাদেশে আজ শত শত শিশুর প্রাণহানি ঘটছে। এ ব্যাপারে ওই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগও উঠেছে।
সবই এখন চাক্ষুষ ঘটনা এবং ব্যাপকভিত্তিক মানুষের মধ্যকার আলোচনা,অভিমত ও দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন। তবে এত সব আলোচনা,অভিমত ও বিচার দাবির পরও দুটি বিষয় কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিতই থেকে যাচ্ছে,যার একটি হচ্ছে,ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় টিকা কেনা কেন বন্ধ করেছিলেন? আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে,শিশুহত্যার মতো এত বড় একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ করা সত্ত্বেও মুহাম্মদ ইউনূস, নূরজাহান বেগম ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার কেন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না?
টিকা কেনা কেন বন্ধ করা হয়েছিল,সে প্রশ্নের জবাব অনুসন্ধান করা দরকার। একটু পিছনে ফিরলে দেখতে পাওয়া যায় - ২০০৬ সালে অধ্যাপক ইউনূস প্রতিষ্ঠা করেন গ্রামীণ হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস (জিএইচসি) লিমিটেড। এর আওতায় রয়েছে গ্রামীণ কল্যাণ নামের স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক,চক্ষু হাসপাতাল,নার্সিং কলেজ,হেলথ টেকনোলজি ইনস্টিটিউট সহ অনেক কিছু। অন্তর্বর্তী সরকার থেকে বিদায় নেওয়ার পর মুহাম্মদ ইউনূস বর্তমানে এই গ্রামীন হেল্থ কেয়ার ব্যবসার গতি বাড়াবার চেষ্টা করছেন। ফেসবুকে দেখা যাচ্ছে,তিনি বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবা-সংক্রান্ত ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চান সামাজিক ব্যবসা নাম দিয়ে। প্রশ্ন উঠতে পারে তবে কি গ্রামীণ হেলথ সার্ভিসেসকে টিকা আমদানির সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই ইউনিসেফকে সরিয়ে দিয়ে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার চেষ্টা হয়েছিল?
গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৫০০ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশে একটা ব্যাপার দেখা যায়,যখন কোনো ঘটনায় একের পর এক মৃত্যু হতে থাকে,তখন সেটা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার হিসেবে গ্রহণ করার সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হামে টিকা কেনার ব্যর্থতার কথা আমরা জানি। কিন্তু সেই ব্যর্থতাকে দায়ী করে বর্তমান সরকার কোনোভাবেই পার পেতে পারে না। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা যে কতটা নাজুক,সেটা এ ঘটনায় প্রকাশিত হয়েছে।
যথাসময়ে টিকা না দেওয়ার কারণে হামে যেকোনো শিশু আক্রান্ত হতে পারে। কিন্তু হামে আক্রান্ত হওয়ার পর কেন যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না, এ দায় কি রাষ্ট্র এড়াতে পারে? আর শিশুদের চিকিৎসা করাতে গিয়ে কত পরিবার যে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়টা কারও নজরে পড়ছে না।
একটি দেশে নিছক প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে একসঙ্গে শত শত শিশুর প্রাণ চলে যাওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়, এটি একটি জাতীয় বিপর্যয়। আর এই বিপর্যয়ের পেছনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চরম উদাসীনতা ও ব্যর্থতাই মূলত দায়ী। যখন প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুদের জীবন শেষ হয়ে যায়,তখন বুঝতে হবে স্বাস্থ্য খাতের মূল ভিত ভেঙে পড়েছে।
শিশুদের মৃত্যু কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়;প্রতিটি মৃত্যুই এক একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের ঘুম ভাঙবে কবে?
Comments