উন্নয়নের বড় বাজেট, বাস্তবায়নের বড় প্রশ্ন
বাংলাদেশের নতুন বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ঘোষণা করেছে। গত আট বছরের মধ্যে এটিই এক বছরে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি। অন্তর্বর্তী সরকারের মিতব্যয়ী নীতির পর এটি নিঃসন্দেহে এক নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা বহন করে। সরকার বোঝাতে চাচ্ছে-এখন আর শুধু ব্যয় সংকোচন নয়, বরং উন্নয়ন ও সংস্কারের মধ্য দিয়েই অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে।
এই বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় বরাদ্দ। শিক্ষা পেয়েছে মোট এডিপির প্রায় ১৫.৮৬ শতাংশ, আর স্বাস্থ্য পেয়েছে ১১.৮৪ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরে এই দুই খাতে বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন স্থবির অবস্থায় ছিল। ফলে হাসপাতাল গুলোতে চিকিৎসাসেবা সংকট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানহীন অবকাঠামো এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। নতুন সরকার অন্তত কাগজে-কলমে সেই জায়গায় জোর দিচ্ছে।
পরিবহন ও যোগাযোগ খাত সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য স্বাভাবিক। কারণ অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়া শিল্পায়ন, বিনিয়োগ বা কর্মসংস্থান-কোনোটিই গতি পায় না। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে, বড় বড় প্রকল্পের সঙ্গে দুর্নীতি, সময়ক্ষেপণ ও ব্যয় বৃদ্ধি প্রায় অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে থাকে। তাই শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না,প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ১১ শতাংশ বরাদ্দও গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং জ্বালানি আমদানির চাপ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নাজুক অবস্থায় ফেলেছে। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাওয়ার কথা বলছে, যা সময়োপযোগী। কিন্তু বাস্তবে সৌর বা বায়ুশক্তি প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রযুক্তি এবং দক্ষতা ছাড়া এই রূপান্তর সম্ভব নয়।
এবারের এডিপির আরেকটি আলোচিত দিক হলো সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ধর্মীয় নেতাদের ভাতা-এসব কর্মসূচিতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে পরিবার কার্ডে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই সহায়তা কতটা টেকসই এবং কতটা উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে অবদান রাখবে? সামাজিক নিরাপত্তা দরকার, কিন্তু তা যেন ভোটমুখী জনপ্রিয়তা অর্জনের হাতিয়ার না হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো বাস্তবায়ন সক্ষমতা। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৩৬.১৬ শতাংশ-পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থাৎ সমস্যা বরাদ্দে নয়, সমস্যা বাস্তবায়নে। প্রকল্প পরিকল্পনায় দুর্বলতা, প্রশাসনিক জটিলতা, অদক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব-এসব কারণে উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশ প্রায়ই অব্যবহৃত থেকে যায়।
অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মন্তব্য তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি তিনি যে 'ঘোষণা ও বাস্তব ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান'কে বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার কাঠামোগত সমস্যা বলেছেন, সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই। আমাদের দেশে উন্নয়নের ভাষণ অনেক বড়, কিন্তু বাস্তব অর্জন প্রায়ই প্রত্যাশার চেয়ে ছোট।
নতুন সরকারের এই উচ্চাভিলাষী এডিপি তাই একই সঙ্গে আশার এবং সংশয়ের। যদি সুশাসন, জবাবদিহি ও দক্ষ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এই বাজেট দেশের মানবসম্পদ, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। আর যদি পুরোনো ব্যর্থতার ধারাই চলতে থাকে, তাহলে এই বিশাল বরাদ্দও শেষ পর্যন্ত কেবল কাগুজে উন্নয়নের গল্প হয়েই থাকবে।
Comments