অবনতি, বাস্তবতার অন্ধকার: বাংলাদেশের গণমাধ্যম কোথায় দাঁড়িয়ে
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা যতই আবেগপ্রবণ হোক,শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার কঠিন মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায় সূচক ও পরিসংখ্যান। আর সেই পরিসংখ্যানই বলছে-দেশের সংবাদমাধ্যম এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে,যা কেবল রাজনৈতিক বিতর্ক নয়,বরং গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য একটি সতর্ক সংকেত।
সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স সানস ফ্রন্টিয়ার্স (আরএসএফ)-এর ২০২৬ সালের বিশ্ব গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম। মাত্র এক বছর আগেও,অর্থাৎ ২০২৫ সালে,এই অবস্থান ছিল ১৪৯তম। অর্থাৎ এক বছরে তিন ধাপ অবনতি-যা সামান্য মনে হলেও ধারাবাহিক পতনের ইঙ্গিত বহন করে। এই সূচক কেবল একটি সংখ্যা নয়;এটি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ,আইনি কাঠামো,নিরাপত্তা এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতার একটি সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি।
কিন্তু সূচকের চেয়েও কঠিন বাস্তবতা ফুটে ওঠে দেশীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যানে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অন্তত ৩৮১টি নিপীড়ন, হামলা ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি সংখ্যা একটি ঘটনার প্রতিনিধিত্ব করে, আর প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে কোনো না কোনো সাংবাদিকের আহত শরীর, আতঙ্কিত পরিবার এবং স্তব্ধ সংবাদকক্ষ।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) আরও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। তাদের হিসেবে,২০২৫ সালে ২৮৯টি ঘটনায় মোট ৬৪১ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে একজন নিহত হয়েছেন,২৯৫ জন আহত হয়েছেন,১৬৩ জন হুমকি বা লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন এবং ১৭০ জন পড়েছেন আইনি হয়রানির মুখে। এছাড়া ৪৬টি মামলায় অন্তত ১২ জন সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়েছেন। এই সংখ্যাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়;বরং একটি ধারাবাহিক প্রবণতার প্রতিফলন।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর তথ্যও একই রকম উদ্বেগজনক। তাদের হিসেবে,২০২৫ সালে ৩১৮টি ঘটনায় অন্তত ৫৩৯ জন সাংবাদিক হত্যা,নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। ভিন্ন সংস্থার হিসাব ভিন্ন হতে পারে,কিন্তু একটি বিষয়ে তারা একমত-সাংবাদিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভয়াবহভাবে অবনতি হয়েছে।
এই পরিসংখ্যানগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ। আরএসএফ জানিয়েছে, একই বছরে বিভিন্ন অভিযোগ ও মামলায় কমপক্ষে পাঁচজন সাংবাদিক আটক হয়েছেন। অর্থাৎ কেবল মাঠপর্যায়ের সহিংসতাই নয়,আইনি কাঠামোর মাধ্যমেও চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার প্রিন্ট মিডিয়া,৩০টি রেডিও স্টেশন,৩০টির বেশি টেলিভিশন চ্যানেল এবং কয়েকশ অনলাইন সংবাদমাধ্যম সক্রিয়। সংখ্যার দিক থেকে এটি একটি বিশাল গণমাধ্যম কাঠামো। কিন্তু প্রশ্ন হলো-এই বিপুল সংখ্যার মধ্যে কতগুলো প্রতিষ্ঠান প্রকৃত অর্থে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে?
বাস্তবতা হলো,সাংবাদিকতা আজ দুই ধরনের চাপের মুখে। একদিকে রাষ্ট্রীয় চাপ-মামলা,গ্রেপ্তার,আইনি হয়রানি;অন্যদিকে অপ্রাতিষ্ঠানিক চাপ-রাজনৈতিক কর্মী,সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং সবচেয়ে নতুন সংযোজন,মব সহিংসতা। কোনো সংবাদ বা মতামতের কারণে সাংবাদিকদের ওপর তাৎক্ষণিক হামলা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়;বরং এটি একটি নিয়মিত ঝুঁকি।
বিশেষ করে মব সহিংসতার বিষয়টি উদ্বেগজনক। কোনো ফেসবুক পোস্ট বা প্রতিবেদনের জেরে সাংবাদিককে ঘিরে ধরে মারধর,লাঞ্ছনা-এ যেন প্রকাশ্য বিচারবহির্ভূত শাস্তি। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ধীর বা অনুপস্থিত,যা এই ধরনের সহিংসতাকে আরও উৎসাহিত করে।
এই পরিস্থিতিতে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেল্ফ-সেন্সরশিপ সাংবাদিকতার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। সম্ভাব্য মামলার ভয়, হামলার আশঙ্কা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার হিসাব—সব মিলিয়ে অনেক সংবাদ প্রকাশের আগেই থেমে যাচ্ছে। ফলে সমাজ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে,আর ক্ষমতার জবাবদিহিতা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে-এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? বাস্তবতা হলো,এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যা। সরকার পরিবর্তন হলেও গণমাধ্যমের মৌলিক সংকটগুলো থেকে যাচ্ছে। মালিকানা কাঠামো,রাজনৈতিক আনুগত্য এবং পেশাগত বিভাজন-সব মিলিয়ে একটি জটিল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ের কিছু সহিংস ঘটনা এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার অফিসে হামলা,সাংবাদিকদের শারীরিক হেনস্তা-এসব ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে যে, কোনো প্রতিষ্ঠানই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। এটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণ নয়;বরং পুরো গণমাধ্যম ব্যবস্থার ওপর আঘাত।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো বিলাসিতা নয়;এটি গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। যখন সাংবাদিকরা নিরাপদ থাকে না, তখন সত্যও নিরাপদ থাকে না। আর সত্য নিরাপদ না থাকলে,গণতন্ত্র কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
সমাধানের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন আইনের কার্যকর প্রয়োগ। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করতে হবে এবং হামলার ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। যাদের বিনাবিচারে আটকে রাখা হয়েছে তাদের মুক্তি দিতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক সহনশীলতা বাড়াতে হবে,যাতে সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা না হয়।
সবশেষে একটি কথাই গুরুত্বপূর্ণ-পরিসংখ্যান কখনো মিথ্যা বলে না,কিন্তু তা সবকিছু বলে না। সংখ্যার আড়ালে যে ভয়,যে নীরবতা,যে ভাঙা সাহস লুকিয়ে আছে-সেটিই আসল সংকট। আর এই সংকট মোকাবিলা করা এখন সময়ের দাবি।
কারণ ইতিহাস শুধু ঘটনা মনে রাখে না; এটি সংখ্যাও মনে রাখে। আর সেই সংখ্যাগুলোই একদিন বলে দেবে-এই সময়ে আমরা কতটা স্বাধীন ছিলাম।
প্রশ্ন উঠে - অধ্যাপক ইউনূসের অন্তবর্তী সরকারের সময় নাকি বাংলাদেশ সবকিছুতে ভালো হয়ে গিয়েছিল? তাহলে মত প্রকাশের এই অবস্থা কেন? নোবেল জয়ী সরকারের নির্লিপ্তায় কেন পুড়ে যায় সবচেয়ে বড় দুই পত্রিকা অফিস?
Comments