রক্ত, সংগ্রাম ও আশার মে দিবস
সারা বিশ্ব আজ এক গভীর অস্থিরতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, ফিলিস্তিনের গাজায় দীর্ঘদিনের সহিংসতা-সব মিলিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি চাপে রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে, উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে, বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের ওপর। এমন এক প্রেক্ষাপটে এসেছে মহান মে দিবস-যে দিনটি শ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও সংগ্রামের প্রতীক।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে ৫ আগস্টে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের শ্রমিকদের জীবনে নেমে এসেছিল ঘোর অন্ধকার। নোবেল জয়ী অধ্যাপক ইউনূনের নেতৃত্বে গঠিত অন্তবর্তী সরকারের পুরো দেড়টা বছরই ছিল নিপীড়নের মহা উৎসব।
শ্রমিকের রক্ত, নারী-পুরুষ-শিশুর রক্ত, গণমাধ্যমকর্মীদের রক্ত, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের রক্ত, চিকিৎসকদের রক্ত, শিল্পী-সাহিত্যিকদের রক্ত, সংখ্যালঘুর রক্ত, পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের রক্ত, মুক্তিযোদ্ধার রক্ত, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলের কর্মীদের রক্তপ্রবাহ অব্যাহত থেকেছে তার পুরো সময়।
আজ যেহেতু মে দিবস, তাই শ্রমিক ভাই বোনদের কথাই উচ্চারিত হোক। এ বছর ২৬ জানুয়ারিতে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয় বাংলাদেশ প্রতিদিনে। পত্রিকাটি স্থানীয় শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় বছরে গাজীপুর,সাভার ও আশুলিয়ায় স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে ছোট-বড় ৩২৭টি কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে বেকার হয়ে পড়েছেন এক লাখ ১৫ হাজার ৩৭৯ জন শ্রমিক। এর মধ্যে স্থায়ীভাবে কারখানা বন্ধ হওয়ায় বেকার হন ৯০ হাজার ৭৬০ শ্রমিক-কর্মচারী।
শিল্প পুলিশের তথ্য বলছে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর প্রায় দেড় বছরে সাভার ও আশুলিয়ায় ১৩৯টি কারখানা বন্ধ করা হয়েছে। এসব কারখানার প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। বেকার শ্রমিকদের ৯০ শতাংশই বেকার রয়েছেন। অনেকে পেশা বদল করেছেন। কেউ কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ দিনমজুরির কাজ করছেন। আবার কেউ পা দিয়েছেন অপরাধজগতে। কারখানা বন্ধের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অন্য ব্যবসা-বাণিজ্যে।
প্রতি বছর সারা বিশ্বে এই দিনটি পালিত হয় প্রতীকী দিন হিসেবে। শ্রমজীবী মেহনতি মানুষদের দিন হিসেবে। মে দিবস হাজার হাজার শ্রমিকের পথ চলা মিছিলের কথা, একই পতাকা তলে দাঁড়িয়ে আপোষহীন সংগ্রামের কথা। মে দিবস দুনিয়ার সব শ্রমিকদের এক হওয়ার দিন। আন্তর্জাতিক সংগ্রাম আর সৌভ্রাতৃত্বের দিন। মে দিবস শ্রমজীবী মানুষের কাছে জাগরণের গান, সংগ্রামের ঐক্য ও গভীর প্রেরণা।
মে দিবস আসলে শোষণমুক্তির অঙ্গীকার, ধনকুবেরদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সাম্য গড়ে তোলার শপথ নেওয়ার দিন। কীভাবে এই দিনটি পরিণত হলো এই মে দিবস হিসাবে সে ইতিহাস কমবেশি সকলেরই জানা, ইতিহাসের পাতায় চোখ ফেরালেই আমরা জানতে পারি শ্রমজীবী মানুষদের সেই আন্দোলনের কথা।
মেহনতি মানুষদের এই আন্দোলনের পথ কখনও মসৃণ ছিল না। ছিল নানা ঘটনার ঘাত প্রতিঘাতে মোড়া। জুলুম, অত্যাচার, প্রতিরোধ, ধর্মঘট, মিছিল, সংগ্রামের কাহিনি রয়েছে এই দিনটার পিছনে।
এই বাস্তবতায় মে দিবসের তাৎপর্য নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। মে দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের স্মারক। ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে শ্রমিকরা যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন,তা আজও শ্রমিক অধিকারের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই আন্দোলনে শ্রমিকদের আত্মত্যাগ বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে একতা ও সংগ্রামের চেতনা সৃষ্টি করেছিল।
আজ এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের লড়াই সবচেয়ে কঠিন। এই লড়াই জীবনে বেঁচে থাকার লড়াই। যে আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যে অধ্যাপক ইউনূস জাতিকে ফেলে রেখে গেছেন,তাতে কাজ হারিয়েছেন হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ। তাদের জীবনে নেমে এসেছে ভয়ঙ্কর কালো দিন।
নতুন সরকার, নতুন স্বপ্ন। কিন্তু ইরান যুদ্ধ আজ নতুন করে অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করছে। আজ এই ভয়ঙ্কর সঙ্কটের সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী সব শ্রমিকের কল্যাণের কথা বলছেন। কারণ ইউনুষ কালে ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন তাদের ভবিষ্যৎ আজ সম্পূর্ণই অনিশ্চিত।
ইউনূস জামানার ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে সারা দেশ মুক্তি পেতে অপেক্ষায় প্রহর গুনেছে দেশের প্রতিটি মানুষ। এসেছে আবার নতুন সকাল। কিন্তু শ্রমিকদের জীবনে তার সময়ে যে আঁধার নেমে এসেছিল সেটা তারা কাটিয়ে উঠবে কীভাবে! তাঁদের জীবন থেকে যদি কলকারখানা,হাতুড়ি পেটানোর আওয়াজ চলে যায়, তাহলে মে দিবস পালনের ওই মুষ্টিবদ্ধ হাত আর কখনও উপরে উঠবে না।
কাজ হারানো শ্রমিকদের কথা একটু ভাবেন এটাই প্রত্যাশা করি। এই শ্রমিকদের জন্য যেন কিছু বিকল্প রাস্তা ভাবা হয়। যে সব মানুষদের কাছে এই মানুষগুলো কাজ করছিলেন তাঁরাও যেন পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে যথাসম্ভব মানবিকতার হাত বাড়িয়ে সাহায্য করেন।
যারা কাজ হারিয়েছেন তাদের কাজ ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হোক। তবেই এই মানুষগুলো আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবেন। সমাজ দাঁড়াতে পারবে। আমরা পালন করতে পারব মে দিবস। মুষ্টিবদ্ধ হাত উপরে উঠবে। শ্রমদিবসের লড়াইও সার্থক হবে।
Comments