নিঃশব্দ বিপর্যয়: ক্ষুধা
বাংলাদেশ সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামল দেশ; নদীমাতৃক সংস্কৃতি আর পরিশ্রমী মানুষের ভূমি। মাঠে ভোরবেলার হাওয়া, লাঙল আর বীজে ভর করে রাখা কৃষকের আস্থা—এসবই আমাদের মনে আশার আলো জাগায়। কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষ যে অতীতের বহু সংকটকে নিজেদের শ্রম ও সৃজনশীলতা দিয়ে জয় করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই প্রত্যাশার আড়ালে আজ লুকিয়ে আছে এক নিঃশব্দ বিপর্যয়: ক্ষুধা। এই ক্ষুধা কোনো সংখ্যার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি প্রতিটি পরিবারের দরজায় কড়া নাড়ছে, প্রতিটি শিশুর কলকাকলিতে হাহাকার মিশিয়ে দিচ্ছে।
নগর-বন্দর ও শিল্পের আড়ালে ক্ষুধার ছায়া ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। টিসিবির ট্রাকের পেছনে কদাকার দীর্ঘ সারি এখন আর উপেক্ষা করার মতো কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; বরং এটি ইঙ্গিত দেয় যে আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার ফাঁকফোকর আরও গভীর হচ্ছে। যেখানে একদিকে রেকর্ড কৃষি উৎপাদন হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিদিন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সেইসব মানুষের সংখ্যা, যাদের পরবর্তী বেলার খাবারের কোনো নিশ্চয়তা নেই। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার যৌথ প্রতিবেদন অনুযায়ী—প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ বাংলাদেশি বর্তমানে তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মুখে। এই সংখ্যা কেবল কোনো পরিসংখ্যান নয়; এটি অনাহারী মা-বাবা, শিশু ও বৃদ্ধ মানুষের হাহাকারের নাম।
২০২৪ সালের বিধ্বংসী বন্যা ছিল একটি বিশাল ধাক্কা। সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু ফসলই নষ্ট করেনি, ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে কৃষক পরিবারের বহু বছরের সঞ্চয় এবং কেড়ে নিয়েছে জমির উর্বরতা। একই সঙ্গে অব্যাহত মূল্যস্ফীতি ও বাজারের অস্থিরতা খাদ্যনির্ভর অসংখ্য পরিবারকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া এবং বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এই দিশাহীনতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে ভোক্তাস্তরে খাদ্যের দাম বাড়ছে এবং পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে পুষ্টিকর খাবার ত্যাগ করে সস্তা ও পুষ্টিহীন ক্যালোরির দিকে ঝুঁকছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর এক ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলছে।
সবচেয়ে নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে কক্সবাজারে। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির ও পার্শ্ববর্তী স্থানীয় জনবসতি একসঙ্গে তীব্র চাপের মুখে পড়েছে। সীমিত সম্পদ ও সেবার ওপর অতিরিক্ত ভাগীদার তৈরি হওয়ায় স্থানীয় ও শরণার্থী—উভয় পক্ষই সংকটে। খাদ্য পুনর্বণ্টন ও সহায়তা কার্যক্রমের ঘাটতিতে শরণার্থীরা দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র শিশুদের ক্ষেত্রে। প্রতিবেদন বলছে, প্রায় ১৬ লাখ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে এবং লক্ষাধিক শিশুর জীবন বর্তমানে সংকটাপন্ন। একজন শিশুর ক্ষুধার বিরুদ্ধে এই লড়াই শুধু তার শরীর নয়, তার মানসিক বিকাশ ও সামগ্রিক ভবিষ্যৎকেও অন্ধকার করে দিচ্ছে, যা একটি জাতির জন্য অশনিসংকেত।
ক্ষুধা শুধু খাদ্যের অভাব নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি। এই দুর্বলতা মানুষকে এক দুষ্টচক্রে আটকে ফেলছে। পেটের তাগিদে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করা, পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া কিংবা চিকিৎসার খরচ কমিয়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তগুলো দীর্ঘমেয়াদে পরিবারগুলোর সক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে। ফলে ক্ষুধার এই বিষময় প্রভাব বহু প্রজন্ম পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এখনই সম্মিলিত ও ত্বরিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। সরকারের পাশাপাশি জাতিসংঘ, এনজিও, স্থানীয় সমাজসেবক এবং বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। জরুরি খাদ্য সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে, তবে তা যেন অবশ্যই পুষ্টিসমৃদ্ধ এবং মা ও শিশু-কেন্দ্রিক হয়। পাশাপাশি কৃষিতে স্থায়িত্ব ফিরিয়ে আনতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বন্যা-প্রতিরোধী ও জলমগ্নতা সহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবন, শস্যের বৈচিত্র্যকরণ এবং সেচ ও বীজ প্রযুক্তির উন্নয়ন কৃষককে আগামী দিনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সাহায্য করবে।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে আরও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। খাদ্য মঞ্জুরি ও নগদ সহায়তা এমনভাবে নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনো মানুষ অনাহারে না থাকে। স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টি শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে অপুষ্টি মোকাবিলায় নিয়মিত মনিটরিং এবং তরুণ পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন। ভৌগোলিকভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করলে সীমিত বাজেটেও সেরা ফলাফল পাওয়া সম্ভব।
একই সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থা সচল রাখা জরুরি। বাজার মনিটরিং ও সঠিক নীতির মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন সহজীকরণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের সরাসরি বাজার সংযোগ দেওয়া গেলে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে। সর্বোপরি, কমিউনিটিগুলোকে সম্পৃক্ত করে খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।
Comments