পুরনো দামে জ্বালানি, নতুন দামে বাসভাড়া
ডিজেলের দাম ২০২২ সালের আগস্টে এক লাফে ৮০ থেকে ১১৪ টাকা লিটার হয়। সেই সময়ে ঢাকায় বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ২ টাকা ১৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তী সময় তিন ধাপে ডিজেলের দাম কমে ১০০ টাকা লিটার হলে ভাড়া কমে হয় ২ টাকা ৪২ পয়সা। এবার আবার ডিজেলের দাম ১১৫ হওয়ায় ঢাকা এবং চট্টগ্রাম মহানগরের বাসের ভাড়া বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২ টাকা ৫৩ পয়সা।
ডিজেলের দাম ২০২২ সালের চেয়ে ১ টাকা বেশি হলেও সেই সময়ের চেয়ে ভাড়া বেড়েছে ৩ পয়সা। ৫২ আসনের দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ২৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ ও ঢাকা জেলায় বাসের ভাড়া ২ টাকা ৩২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে কিলোমিটারে ২ টাকা ৪৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা এবং চট্টগ্রাম মহানগরে বাস ও মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া আগের মতোই ১০ এবং ৮ টাকা থাকবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ভাড়া বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। এর আগে সংবাদ সম্মেলনে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ভাড়া নির্ধারণ কমিটি কিলোমিটারে ২২ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির সুপারিশ করলেও সরকার ১১ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকেই তা কার্যকর হবে।
প্রজ্ঞাপনে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ২ টাকা ২৩ পয়সা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে ৫২ আসনের বাস না থাকায় ৪০ আসনের দূরপাল্লার বাসে এই ভাড়া হবে ২ টাকা ৯০ পয়সা। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের দূরত্ব ১১৫ কিলোমিটার। এই পথে ৪০ আসনের বাসে ভাড়া ছিল ৩১০ টাকা। গতকাল থেকে তা হয়েছে ৩৩৪ টাকা। ২৪ টাকা ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিজেলের দাম ২০২২ সালের আগস্টের প্রায় সমান হলেও সেই সময়ের তুলনায় ভাড়া কিলোমিটারে ৩ থেকে ৪ পয়সা বেড়েছে বাস পরিচালনায় অন্যান্য খরচে।
সরকার যে ভাড়া নির্ধারণ করে তা অতীতে না মানার নজির রয়েছে। সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, এবার না মানলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করেই ১১ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়েছে। মালিকরা অঙ্গীকার করেছেন, তারা এই সিদ্ধান্ত কঠোরভাবে মেনে চলবেন।
২০২২ সালের আগস্টেই ডিজেলের দাম লিটারে পাঁচ টাকা কমানোর পর বাসের ভাড়া কিলোমিটারে পাঁচ পয়সা কমানো হয়। পরে দুই ধাপে আরও তিন পয়সা কমানো হয়েছিল। ২০২২ সালের হিসাব ধরলে বাসের ভাড়া হওয়ার কথা ছিল দুই টাকা ৫১ পয়সা। তবে ঢাকায় বাসের ভাড়া দুই টাকা ৫৩ পয়সা হয়েছে অন্যান্য ব্যয়ের কারণে। যদিও কমিটির সুপারিশ ছিল দুই টাকা ৬৪ পয়সা ভাড়া নির্ধারণের।
মালিকদের ভাষ্য, পরিবহন খাত ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপে রয়েছে। ডলারের দাম বৃদ্ধিতে আমদানিকৃত খুচরা যন্ত্রাংশ ও সামগ্রিক যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অনেক বেড়েছে। তাই দুই পয়সা ভাড়া বৃদ্ধি স্বাভাবিক।
যদি ভাড়া নির্ধারণের ব্যয় বিশ্লেষণে নানা 'আজগুবি' ব্যয় দেখা গেছে। যেমন ঢাকা শহরে চলা লক্কড়ঝক্কড় বাসগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ মেরামতে বছরে খরচ সোয়া ১০ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। প্রতি তিন মাস অন্তর ২৬ হাজার টাকার টায়ার লাগানোর খরচ দেখানো হয়েছে। ইঞ্জিন ওভারহোলিংয়ে বছরে দুই লাখ ৮০ হাজার টাকা, বাসের সৌন্দর্য রক্ষায় এক লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং চালক-শ্রমিকদের মজুরি বাবদ পৌনে সাত লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। ডিজেল বাবদ খরচ ১৬ লাখ ৪৪ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে।
একাধিক পরিবহন মালিক সমকালের কাছে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেছেন, চাঁদা, পুলিশের ঘুষ বাবদ বছরে প্রতিটি বাসের পেছনে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা যায়। তা ব্যয় বিশ্লেষণে দেখানো যায় না। ফলে বাকি খরচ বাড়িয়ে বাড়িয়ে দেখাতে হয়।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাসে ১৬ এবং দূরপাল্লার বাসে খরচের ১২ খাত দেখানো হয়েছে। মহানগরের বাসের দাম ধরা হয়েছে ৩৫ লাখ টাকা। দূরপাল্লার বাসের দাম ধরা হয়েছে ৮০ লাখ টাকা।
ভাড়া নির্ধারণে দেখানো হয়েছে, নগর পরিবহনের বাসে প্রতি ২৫ দিনে একবার ইঞ্জিন অয়েল (মবিল) বদল করা হয়। বছরে একবার পুরো ইঞ্জিন খুলে (ওভারহোলিং) তা মেরামতে দুই লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ ধরা হয়েছে। দূরপাল্লার বাসে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও ইঞ্জিন ওভারহোলিংয়ে খরচ দেখানো হয়েছে সাড়ে ছয় লাখ টাকা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হাদীউজ্জামান বলেছেন, এত মেরামত রক্ষণাবেক্ষণ হলে বাসের চেহারা লক্কড়ঝক্কড় হতো না।
সড়ক পরিবহন আইনে চালক শ্রমিককে মাসিক বেতনে নিয়োগপত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে নজির নেই। ভাড়া নির্ধারণে ঢাকা বাসে বছরে ছয় লাখ ৭০ হাজার এবং দূরপাল্লার বাসে আট লাখ ৪০ হাজার টাকা মজুরি ও উৎসব ভাতা দেখানো হয়েছে।
Comments