আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের সাফল্য, চুপ কেন ভারত?
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রস্থলে উঠে এসেছে পাকিস্তান। ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতির পরবর্তী আলোচনায় ইসলামাবাদকে বৈঠকের স্থান হিসেবে ঘোষণা এবং সফল মধ্যস্থতাকারী-এসবই পাকিস্তানকে নতুনভাবে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরছে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের নেতৃত্বে এই কূটনৈতিক সফলতা অনেক বিশ্ব নেতার কাছ থেকে প্রশংসা অর্জন করেছে।
পোপ লিও এই যুদ্ধবিরতিকে 'বাস্তব আশার লক্ষণ' হিসেবে অভিহিত করেছেন। একইসঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ইউক্রেনও রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধবিরতির জন্য প্রস্তুত। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ভন ডের লিয়েন পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকাকে প্রশংসা করেছেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির কূটনৈতিক গুরুত্বকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরছে।
এদিকে, কাতার ও সৌদি আরব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের ভূমিকার প্রশংসা করেছে। বিশ্ব নেতারাও সামগ্রিকভাবে পাকিস্তানের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে-দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান আঞ্চলিক শক্তি ভারত এ বিষয়ে কী ভাবছে?
পাকিস্তানের এই উদ্যোগকে অনেক বিশ্লেষক 'কূটনৈতিক পুনরুত্থান' হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা সংকট, অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে থাকা দক্ষিণ এশিয়ার দেশটি এবার নিজেকে একটি 'সমাধানদাতা রাষ্ট্র' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। বিশ্বের একক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম আঞ্চলিক শক্তি ইরানের মতো বৈরী পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনতে চাওয়া নিঃসন্দেহে একটি বড় কূটনৈতিক পদক্ষেপ।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগোফ মন্তব্য করেছিলেন, এই ধরনের উদ্যোগ শুধু প্রতীকী নয়, বরং এটি দেখায় যে আঞ্চলিক শক্তিগুলো এখন বৈশ্বিক আর্থিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় নিজেদের প্রভাব স্পষ্ট করতে চাইছে। যদিও তিনি সরাসরি পাকিস্তানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেননি, তবে তার পর্যবেক্ষণ বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড্যান স্টেইনবক বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ধীরে ধীরে বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে, যেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলো নির্দিষ্ট ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তার এই মন্তব্য পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকাকে একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রবণতার অংশ হিসেবে তুলে ধরে।
তবে এই উত্থানের বিপরীতে ভারতের অবস্থান এখন পর্যন্ত দৃশ্যত নীরব। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের এই সফলতা নিয়ে সরাসরি স্বীকৃতি বা সমালোচনা-কোনোটিই প্রকাশ্যে আসেনি। অনেকের মতে, এটি কোনো দুর্বলতা নয়; বরং একটি কূটনৈতিক কৌশল।
ভারত ঐতিহ্যগতভাবে নিজেকে একটি স্বতন্ত্র ও উদীয়মান বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরে। সে কারণে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকাকে সরাসরি গুরুত্ব দিলে তা কূটনৈতিকভাবে অপ্রয়োজনীয় স্বীকৃতি হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে, পাকিস্তানের অতীত ভূমিকা-বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে-ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারত নিজেও বহু আন্তর্জাতিক ইস্যুতে 'ব্যালান্সিং পাওয়ার' হিসেবে কাজ করতে চায়। ফলে, অন্য কোনো আঞ্চলিক শক্তির উত্থানকে তারা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া না দিয়ে সময় নিয়ে মূল্যায়ন করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এটি একটি নতুন কূটনৈতিক প্রতিযোগিতার ইঙ্গিতও বহন করে। পাকিস্তান যদি সফলভাবে এই মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা ধরে রাখতে পারে, তবে আন্তর্জাতিক পরিসরে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। অন্যদিকে, ভারতকে তখন নতুন করে তার কৌশল নির্ধারণ করতে হতে পারে।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক সক্রিয়তা একদিকে যেমন তার জন্য সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি ভারতের জন্যও একটি নীরব পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 'নীরবতা' এখানে হয়তো দুর্বলতা নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত অপেক্ষা-যেখানে সঠিক সময়েই পাল্টা কূটনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করা হবে।
ভবিষ্যতই বলে দেবে, এই মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা পাকিস্তানকে কতদূর এগিয়ে নিতে পারে এবং ভারত কবে, কীভাবে তার প্রতিক্রিয়া জানাবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত-দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মানচিত্রে নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়ে গেছে।
Comments