তেত্রিশ দিন কেটে গেল, ট্রাম্পের যুদ্ধ জেতা হলো না
ইরানে একযোগে আমেরিকা ও ইসলায়েলের আক্রমণের আজ ৩৩ তম দিন। দুই পরাক্রমশালি দেশ যত সহজে ইরানকে কাবু করে ফেলবে বলে ভেবেছিল তা হয়নি। সমানে লড়ছে ইরান এবং বলতে গেলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন যুদ্ধ বন্ধের সুযোগ খুঁজছেন।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাস বারবার একটি কঠিন সত্যকে সামনে এনেছে-শক্তিশালী হওয়া মানেই জয়ী হওয়া নয়। বর্তমান ইরান সংকটকে ঘিরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র আবারও এমন একটি কৌশলগত ফাঁদে পড়তে পারে, যাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় বলা হয় "asymmetric resolve" বা অসম দৃঢ়তার ফাঁদ।
এই ধারণাটি মূলত বোঝায় এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র অপেক্ষাকৃত দুর্বল একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, কিন্তু সেই দুর্বল রাষ্ট্রটি যুদ্ধ জিততে বা অন্তত টিকে থাকতে অনেক বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকে। ফলে সামরিক শক্তির ভারসাম্য থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধের ফলাফল শক্তিশালী পক্ষের অনুকূলে যায় না। ইরানের ক্ষেত্রে ঠিক এই চিত্রটিই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ইরানের জন্য এই যুদ্ধ কেবল একটি ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত নয়; এটি তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার অস্তিত্বের প্রশ্ন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অস্তিত্বগত সংকট নয়। এই পার্থক্যই দুই দেশের দৃঢ়তার মাত্রাকে ভিন্ন করে তুলেছে। ইরান জানে, এই যুদ্ধে পরাজয় মানে হতে পারে শাসনব্যবস্থার পতন। তাই তারা সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে এই যুদ্ধের গুরুত্ব সীমিত, এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষয়ক্ষতি বাড়লে জনমত দ্রুত নেতিবাচক হয়ে উঠতে পারে।
এই বাস্তবতা ইতোমধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিফলিত হচ্ছে। ইরান বিপুল ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও পিছু হটেনি। বরং তারা আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে, মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে আক্রমণ চালিয়েছে এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক চলাচল বাধাগ্রস্ত করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং যুদ্ধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা ছিল, সামরিক চাপ ও রাজনৈতিক হুমকির মুখে ইরান দ্রুত নতি স্বীকার করবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। বরং ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে যুদ্ধ কখন শেষ হবে, সেই সিদ্ধান্ত তারা নিজেরাই নেবে। এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত হিসাবকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এটি নতুন কিছু নয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে অনেক শক্তিশালী থাকা সত্ত্বেও উত্তর ভিয়েতনামের দৃঢ়তার কাছে পরাজিত হয়। দীর্ঘ আট বছরের যুদ্ধ, বিপুল প্রাণহানি এবং অর্থনৈতিক ব্যয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়। একইভাবে আফগানিস্তানে দুই দশকের লড়াইয়ের পর তালেবানের কাছে কার্যত পরাজয় স্বীকার করতে হয়। এই দুটি উদাহরণই দেখায়, যখন প্রতিপক্ষের দৃঢ়তা বেশি থাকে, তখন সামরিক শক্তি একাই বিজয় নিশ্চিত করতে পারে না।
বর্তমান ইরান পরিস্থিতিতেও সেই একই ধারা দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম হলেও, যুদ্ধের প্রতি তাদের জনসমর্থন দ্রুত কমে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে জনমত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে জনগণের সমর্থন না থাকলে রাজনৈতিক চাপ বেড়ে যায় এবং সরকারকে পিছু হটতে বাধ্য করে। ইতোমধ্যেই জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে অধিকাংশ আমেরিকান অবস্থান নিয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো ভিন্ন। সেখানে জনমত একইভাবে নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলে না। বরং বাহ্যিক হুমকির মুখে অনেক সময় দেখা যায়, যেখানে জনগণ সরকারের পক্ষে একত্রিত হয়। ফলে ইরান দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম।
Comments